ফিচার

হেরো দাদা না হিরো দাদা, বঞ্চনার ইতিহাসে আসলে লুকিয়ে যে তথ্য

রমেন দাস: বিলাসবহুল বিসিসিআই। সৌরভ তাতে অতীত! মহারাজকীয় সাজ আজ প্রাক্তন! দাদার দেশজ দাদাগিরি স্তিমিত ফের। ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সভাপতি পদে সৌরভের বিদায় থেকেই এইরকম একাধিক প্রশ্নে জর্জরিত বাংলা-বাঙালি এবং রাজনীতি!

সে আবার কী! খেলায় আবার রাজনীতি! এখানে আবার নেতা, খ্যাতার কী দরকার দাদা? নাহ্, সেগুরে এবার বালি! সেই বালি সাদা না লালচে নাকি সবুজ অথবা গেরুয়া তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সৌরভের বিসিসিআইয়ে বিকশিত হওয়ার শুরু এবং শেষ, সব ক্ষেত্রেই বিরচিত হল রাজনীতি! দাঙ্গা-হাঙ্গামার রাজনৈতিক আবহে নয়া রেকর্ডের স্মৃতির মুখোমুখি হলেন বাঙালির দাদা আর দেশের দাদি!

প্রসঙ্গত, পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে-র আবহে সৌরভ প্রসঙ্গে ছাদনাতলায় নেচে উঠেছে একের পর এক বিতর্ক। তাতে বরাবরের মতো ফ্রোজেন সৌরভ হলেও তার বিতাড়িত-বিতরণে কেঁদে ভাসিয়েছেন ভক্তকুল। হ্যাশট্যাগ বিচার চাই, থুড়ি ফিরবে দাদার ছলে আসলে উঠে এসেছে সেই পর্ব। যেসময় বঞ্চিত বাঙালি আর অবহেলিত বাংলার খেলাধুলার জগতে ধনীর খেলা ক্রিকেটের মঞ্চে জয়গান গ্রথিত করেছিলেন সৌরভ। যে মানুষটি জনের ‘রাইট’ পথের শেষে গ্রেগ চ্যাপেলীয় ‘অত্যাচারে’ হয়েছিলেন কোণঠাসা। একদা কঠিন প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে লড়ে যাওয়া অধিনায়ক সৌরভকেই হেরে যেতে হয়েছিল বারবার। বিশের দশকের প্রথম দশকে অসম্মানিত মহারাজ, জীবনের সমস্ত কিছু ত্যাগের পরেও সরে গিয়েছিলেন অচিরেই। রাহুলময় চ্যাপেল, ধোনির প্রভাবে নির্ধন হতে হয়েছিল দাদাকে। তবুও কি হেরেছেন তিনি?

অর্থ। বৈভব। আভিজাত্য ভরা বেহালার গঙ্গোপাধ্যায় বাড়ির ছেলেটার এসব কী করতেই হত? অন্তর্বাস থেকে গুটখার বিজ্ঞাপনে কোটি কোটি কামানোর নেশায় তখনই মত্ত হতে পারতেন তিনি। বলে যেতে পারতেন; ওহে চ্যাপেল তুমি দূর হঠ, কর কূটকচালি! আমিও বাপু নড়ছি না আর, আমি যে বাঙালি, জয় মা কালী!

রূপকার্থে এ কথা সৌরভ না বললেও সেই দিনের সেই মানসিক চাপ, লড়াই, অবহেলা, বঞ্চনায় যেমন ফুঁসে উঠেছিল এই বাংলা। অনেকেই বলছেন, গতকাল অর্থাৎ ১১ অক্টোবর থেকে সেই অবস্থায় হয়েছে ফের। সময় বদলেছে, এখন হাজির হয়েছে সোশ্যাল-দুনিয়া। হ্যাশট্যাগেই হ্যাজ নামানো যাচ্ছে মুহূর্তেই।

কিন্তু এই আবেগ, কান্না আর সৌরভের বঞ্চনার ইতিহাসে সত্যিই কি জড়িত রাজনীতি? একথার উত্তর পেতে হলে যেতে হবে ২০১১ সালের আগে। এ রাজ্যে তখন বাম-শাসন । শিলিগুড়ির বামনেতা, রাজ্যের তৎকালীন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল সৌরভের। জ্যোতি বসু স্নেহ করতেন বেহালার বিত্তবান গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারকে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন আদরের। অনেকেই বলতেন সৌরভ পুরো সিপিএম! একটুও অন্যথা নেই সেখানে। এমনকি ২০১১ সালের নির্বাচনে বামেদের দুর্দিনে বাম-মুখ হতে পারেন সৌরভ, হাওয়ায় ভেসেছিল এই খবরও। কিন্তু নড়েননি তিনি। থেকেছেন অটল।

২০১১ পরবর্তী সময়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পরে দিদির সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো হয়েছে তাঁর। নবান্নে দেখা। একসঙ্গে একাধিক অনুষ্ঠান-সৌজন্যে সৌরভ হয়েছেন মমতার কাছের মানুষ। আর এই সূত্রেই ফের সেই কোণঠাসা সৌরভ বিকশিত হয়েছেন নতুনভাবে। দিদির সাহায্য, জগমোহন ডালমিয়ার মৃত্যু। সৌরভকে ফিরিয়ে এনেছে এক অন্য ভূমিকায়। রাজ্যের ক্রিকেট সংস্থার প্রশাসক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। অভিষেক ডালমিয়াকে সঙ্গে নিয়ে রাজ্যের ক্রিকেটের হাল ধরেছেন সৌরভ।

তার আগেও বঞ্চিত, তথাকথিত রাজনীতির শিকার হয়েছেন সৌরভ। আইপিএল নিলামে একটা সময় দাম পাননি এই দুঁদে ক্রিকেটার। দেশের অন্যতম ক্রিকেট অধিনায়ক বাদ পড়েছেন। নিজের শহরের দল, ‘বন্ধু’ শাহরুখ খানের দলে জায়গা হয়নি তাঁর।

সিএবি সভাপতি হওয়ার পরেও রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়েছে তাঁর নাম। সৌরভ যে এবার তৃণমূলের হয়েছে, এই অভিযোগ করেছিলেন কেউ কেউ। ফের চাকা ঘুরেছে। প্রায় এক দশক পরে যে লড়াইয়ের ময়দানে সফল সৌরভ আসছিলেন, সেখানেই ক্রমশ জড়িয়ে যাচ্ছিল রাজনীতি!

২০১৯ সাল। লোকসভা নির্বাচন সদ্য সমাপ্ত। ফের ক্ষমতায় এসেছেন নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি। এদিকে বেটিং দুর্নীতি তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত বিশেষ তদন্ত কমিটির সদস্য হয়েছেন সৌরভ। সেই বিতর্কের মধ্যেই এবার যুদ্ধ জিতলেন ‘বঞ্চিত’ মহারাজ! যে রাজনৈতিক যোগের অভিযোগ আগেই উঠেছিল, সেই অভিযোগ আবার উঠিয়ে এবার দেশের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান নির্বাচিত হলেন তিনি। সঙ্গে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পুত্র জয় শাহ। দাবি করা হল, বঙ্গের রাজনৈতিক আবহে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি-র মুখ হবেন সৌরভ। অর্থাৎ সিপিআইএম, মাঝে কংগ্রেস, তারপর তৃণমূল ছেড়ে সৌরভ হাজির হলেন বিজেপি-তে!

মহারাজের একাকি-যুদ্ধে যাঁদের কাঁটা ছিল সর্বাধিক। তাঁরাই সরলেন একে একে। রবির শাস্ত্রীয় সত্তা হল অতীত। বাঙালি, একদা বঞ্চিত সৌরভ এগিয়ে গেলেন নিজের মতো করেই। বিদেশে আইপিএল, করোনা-কালেও তাঁর আমলেই বিপুল আয় করল বিসিসিআই।

ভালোই চলছিল সব। কিন্তু ফের! আবারও যুদ্ধের মুখোমুখি হলেন মহারাজ। রাজ্যসভার প্রার্থী হচ্ছেন, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া; একাধিক ঘনঘটায় বিকশিত সৌরভ বিতর্কে জড়িয়েছেন আবার।

২০২২ এর অক্টোবর। ফের তোলপাড়। আলোচনার কেন্দ্রে সেই সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। বিসিসিআই সভাপতির পদ থেকে তাঁর বিদায় নিশ্চিত হতেই শুরু হয়েছে জল্পনা। দাবি করা হচ্ছে, ২০২১ -এ রাজ্যে বিজেপি-র মুখ না হওয়া এবং গেরুয়া শিবিরে নাম না লেখানোর দায়ে এই শাস্তি পাচ্ছেন তিনি! তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষের দাবি ঠিক এমনই। একই দাবির দিকে ইঙ্গিত করেছেন রাজ্যের বাম নেতারা। যদিও সৌরভকে নিয়ে রাজনীতির যোগ মানতে নারাজ বিজেপি।

তবুও তো…

সম্প্রতি সৌরভের বাড়িতে নৈশভোজে গিয়েছিলেন অমিত শাহ। সঙ্গে একাধিক বিজেপি নেতা। প্রশ্ন উঠেছিল, এবার কি তাহলে সত্যিই! নাহ্, ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়ের বিজেপি-যোগ এবং রাজ্যসভায় মনোনয়নের খবরও সত্যি হতে দেননি সৌরভ। সমস্ত ঘটনাবলি আর জল্পনা-কল্পলার মধ্যেও তিনি থেকেছেন অনন্য, মৌলিক, অভিনব। জড়াননি রাজনীতিতে। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘আমি বলেছিলাম ব্যক্তিগত ভাবে ওঁর (সৌরভ) রাজনীতিতে না আসা ভালো।’

(একটি বিশিষ্ট সাংবাদমাধ্যমে দেওয়া একটি টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে)

তিনি আসেননি। রাজনীতি থেকে শতযোজন দূরে রেখেছেন নিজেকে। দুর্গা কার্নিভালের মঞ্চে দিদির সঙ্গে গল্পে মশগুল হয়েও তৃণমূলের পতাকা ধরেননি সৌরভ। দলমত নির্বিশেষে সকলের থেকেছেন মহারাজ। আর তার জন্যই কি ফের বঞ্চনা, ফের হার! ফের একঘরে হয়ে যাওয়ার ভ্রুকুটি!

আবেগ আর সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের বিচারে এটাই সত্যি। কিন্তু যদি বলি অন্য কথা? অন্য এক অংশের মতে, গ্রেগ চ্যাপেলীয় সময়, কেন্দ্রের ইউপিএ সরকার। ভারতীয় ক্রিকেট। অধিনায়ক সৌরভ। আর এখনের তুখোড় কৌশলি সৌরভের পার্থক্য ব্যাপক। অর্থাৎ সাদা সাদা কালো কালো-র আঙিনায় ঠিক যেটুকু দেখা যাচ্ছে, সামগ্রিকভাবে সেটাই হয়ত সম্পুর্ণ ঠিক নয়! দাবি, ২০১৯ এর আগে এই রাজ্যে, পরে ২০১৯ থেকে প্রায় ২০২২ এর শেষ পর্যন্ত দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের সর্বময় কর্তা ছিলেন সৌরভ। অর্থাৎ আইপিএল, বঞ্চনা, গ্রেগ চ্যাপেল সব ছাড়িয়ে এই সৌরভ ছিলেন ভিন্ন। সেক্ষেত্রে অমিত শাহ-পুত্র জয় শাহ-সহ কেন্দ্রের মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর, নরেন্দ্র মোদী। সবার সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক তাঁর। একাধারে দেশের ক্রিকেট নক্ষত্র, অন্য দিকে দেশের সর্বোচ্চ পদমর্যাদার ক্রিকেট প্রশাসক। ধারে-ভারে সৌরভ অন্যতম। রাজ্যের ভাবাবেগ, বাঙালি আবেগ এবং নির্বাচন মাথায় রেখে একাজ বিজেপি-প্রভাবে হওয়ার দাবি উঠলেও, সৌরভকে বিজেপি-তে যোগ দেওয়ানোর বিজেপি-চেষ্টার দাবি কেউ কেউ করলেও মহারাজ কখনও কোনও ‘ফাঁদে’ পা দেননি। উপরন্তু রাজনীতির মহীরুহদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রেখেছেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কী হতে চলেছে দাদার? এই অংশেরই দাবি, অতি সহজ নয় সবটা। আইসিসি-তে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই এই জল্পনার মধ্যেই আবার উঠে আসছে আর এক গ্রেগের অবসানের কথা। আইসিসি সভাপতি গ্রেগ বার্কলে। যার মেয়াদ শেষ হবে এই নভেম্বরে। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি আরও একটি সময়কাল থাকতে রাজি হলেও আর সে সৌভাগ্য তাঁর হচ্ছে না। এদিকে শ্রীনিবাসনের দীর্ঘ আইসিসি-অভিজ্ঞতার পরে ভারতের সুযোগ রয়েছে সেই পদে এই দেশ থেকে কেউ যান। এই মুহূর্তে সেই পদে যাওয়ার মতো দেশের প্রাক্তন ক্রিকেটার হিসেবে শচিন তেন্ডুলকর, ভিভিএস লক্ষ্মনের নাম উঠলেও এগিয়ে রয়েছেন সেই সৌরভই। যদিও অনেকেই বলছেন, তিনি সুযোগ নাও পেতে পারেন। তবে যুক্তি বলছে অন্য কথা। আর মাত্র ১ মাস বাকি এই বিষয়টি স্পষ্ট হতে। আইসিসি সভাপতি পদে নির্বাচন হলেও ভোটের পরিমাণ কমেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে ভারতের তরফে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে জেতার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

আর এখানেই বলা হচ্ছে, যতই যা হোক না কেন এবার আইসিসি প্রধান হবেন বলেই নাকি বিসিসিআই সভাপতির পদ ছাড়লেন তিনি! এখানেই দাবি করা হচ্ছে, যদি তাই-ই না হত, তাহলে কেন মুখ খুললেন না সৌরভ। বরাবর চুপ থাকলেও দাদাগিরির অভ্যাস মতো এখানেও চুপ থাকবেন? এতবড় বঞ্চনার শিকার হয়েছেন জেনেও কিছুই বলবেন না এই প্রভাবশালী! আবার কৌশলেই এই কাজ করা হয়েছে বলে মত অনেকের। কীভাবে? দাবি, রাষ্ট্রপতি মনোনীত সদস্য হিসেবে রাজ্যসভায় নিয়ে সৌরভকে দিয়ে গুরুদায়িত্ব সামলানোর কথা ভাবতে পারে কেন্দ্র। বন্ধু জয় শাহের বাবার দলের তরফে এমন হতেও পারে! অবশেষে সব বিতর্কে জল ঢেলে দাদার বাপি বাড়ি যা শট যেতে পারে সংসদের অলিন্দে। যদিও এটি নিছকই জল্পনা!

আর যদি দেখা যায় সত্যিই বঞ্চিত হয়েছেন দাদা। তাহলে? বলা হচ্ছে, সেই ক্ষেত্রেও চাপ নেই মহারাজের। ফের রাজ্যের ক্রিকেট প্রশাসক অথবা এই সংক্রান্ত ক্ষেত্রের মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে আসীন হতে পারেন তিনি। রাজ্যের সরকারেও সৌরভের ভূমিকা যে দেখা যাবে না, এমনও নিশ্চিত বলছেন না কেউ।

আর এসবের পরেই অনেকে বলছেন, কেঁদো না ভক্ত, শান্ত হও, অপেক্ষা কর ফের, তোমার দাদা তেমন আর নেই, হয়েছে রকমফের!

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close