সিনেমাফিচার

অনুপ কুমারকে সিনেমায় নিতেই হবে, প্রযোজকের কাছে জেদ ধরেছিলেন তরুণ মজুমদার

দেবব্রত সরকার 

তৎকালীন বোম্বের বিখ্যাত এক পরিচালক একদিন তাঁর কলকাতার এক ডিস্ট্রিবিউটর বন্ধুকে জানালেন তিনি একটা নতুন হিন্দি সিনেমা প্রযোজনা করতে চান। নতুন এক পরিচালক খুঁজছেন। সেই ডিস্ট্রিবিউটর ভদ্রলোককে খোঁজ দিলেন কলকাতার এক উঠতি পরিচালকের। ছেলেটা ততদিনে আরও দুই জনের সাথে দল বেঁধে খান তিনেক বাংলা সিনেমা পরিচালনা করেছে।
বোম্বের সেই ভদ্রলোকের ডাকে কলকাতার সেই উঠতি পরিচালক পৌঁছালেন বোম্বের রাজকমল স্টুডিওতে।

তাড়াহুড়োতে বোম্বে-গামী বিমানে ওঠার সময় তিনি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছেন মনোজ বসুর ছোটগল্প ‘আংটি চাটুজ্যের ভাই’ অবলম্বনে সম্প্রতি তাঁর করা বাংলা চিত্রনাট্য টাকে। তাঁর খুব ইচ্ছা অনুপ কুমারকে নায়ক করে তিনি এই সিনেমাটা করবেন।
অনুপ কুমার নায়ক! শুনে কলকাতার কোনও প্রযোজক রাজি হয়নি সিনেমা করতে । কেউ কেউ প্রস্তাব দিয়েছেন ছবিতে নায়ক হিসেবে উত্তম কুমারকে নিতে। ছেলেটা নাছোড় বান্দা তিনি ঠিক করেছেন তিনি সেই সিনেমা করলে অনুপ কুমারকে নায়ক করেই করবেন।

বোম্বের রাজকমল স্টুডিওতে পৌঁছে তিনি পরিচিত হলেন সেই ভদ্রলোকের সাথে। নতুন সিনেমা নিয়ে অনেক গল্প হল। তাঁর মাঝে ভদ্রলোক খেয়াল করলেন ছেলেটির হাতে পাকানো আছে কিছু কাগজ।স্বাভাবিক কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করলে কি ওটা? লাজুক ছেলেটি লজ্জাবনত মুখে জানালো, – ও কিছু না আমার সম্প্রতি লেখা একটা চিত্রনাট্য। বাংলায় সিনেমা করব ভেবেছি। ভদ্রলোক বললেন, – অসুবিধা না থাকলে কেমন চিত্রনাট্য একবার শোনাও দেখি। ভদ্রলোকের কথায় চিত্রনাট্যের গল্পটি বলে শোনালেন ছেলেটি। চিত্রনাট্য শুনে ভদ্রলোক অবাক। তিনি যেন এমনই একটা গল্প খুঁজছেন। ভদ্রলোক জানালেন তিনি এই চিত্রনাট্য নিয়েই তিনি বাংলা সিনেমা করবেন। তখনকার মত বাতিল হয়ে গেল হিন্দি সিনেমা তৈরি করার পরিকল্পনা।

ছেলেটি জানালো তাঁর একটা শর্ত আছে। অনুপ কুমারকে নায়ক করতে হবে। ভদ্রলোক তাতেও রাজী। জানালেন ছেলেটাকে সব স্বাধীনতা দেওয়া হবে। সব ঠিক হল। সিনেমায় লোকসঙ্গীতের সুর ব্যবহার করা হবে দেখে নিমরাজি ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ছেলেটি তাঁকেও রাজী করিয়ে তাঁকে দিয়েই সঙ্গীত পরিচালনা করিয়ে শেষ করল সিনেমাটা।রিলিজ হওয়ার সাথে সাথে দেখা গেল সিনেমাটা সুপার ডুপার হিট। সেদিনের সেই সিনেমাটার নাম ছিল ‘পলাতক’। বোম্বের সেই প্রযোজক ভদ্রলোক ছিলেন ভি শান্তারাম আর সেদিনের সেই কলকাতার পরিচালক ছেলেটি ছিলেন শ্রদ্ধেয় তরুণ মজুমদার। বাকীটা ইতিহাস।

কিন্তু তরুণ মজুমদারের চলচ্চিত্র জীবনের শুরুটা এতটা মসৃণ হয়নি। বাড়ি ছিল বাংলাদেশের বগুড়ায়। রাতারাতি সব কিছু ফেলে চলে আসতে হয়েছিল এদেশে মাথার ওপর দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে। নিজেকে এই শহরে মনে হত অবাঞ্ছিত। রসায়ন নিয়ে স্নাতক হওয়ার পর হঠাৎ ঠিক করলেন সিনেমা পরিচালনা করবেন। নিজের পরিচিত এক ভদ্রলোকের সাথে পৌঁছালেন টালিগঞ্জের টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে। কাজ শিখবেন বলে। সময়টা ষাটের দশকের মাঝামাঝি। সেই সময়ে আজকের মতো সিনেমার এ বি সি ডি শেখার জন্য ছিলনা কোনও ফ্লিম ইন্সটিটিউটের ব্যবস্থা। কাজ শিখতে হত দেখে দেখেই।

কিন্তু সুখকর হয়নি অনেক আশা নিয়ে টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে যোগদানের সেই স্মৃতি। সেই কাজ ছাড়তে হয়েছিলে ইউনিয়নের লবি বাজিতে। তারপর আবার স্বপ্ন নিয়ে পথ চলা। একদিন চোখে পড়ে গেলেন কানন দেবীর। শুরু হল ‘যাত্রিক’এর পরিচালনায় উত্তম সুচিত্রার ছবি ‘চাওয়া পাওয়া’ (১৯৫৯) দিয়ে আলোছায়া জগতের হাতে খড়ি। সেটাই তরুণ মজুমদারের হাতে খড়ি। তাঁর আগে কাজের অভিজ্ঞতা বলতে শ্রীমতী পিকচার্সে ‘দেবত্র’ নামে এক স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি। যদিও সেই সিনেমাতে তিনি ছিলেন সহকারী।

সারাজীবনে করেছেন প্রায় ৪১ টি সাহিত্য নির্ভর ছবি। শত প্রলোভন স্বত্বেও নিজস্বতা থেকে সরেন নি। বজায় রেখেছেন গল্পের পরিবেশ। আর সেখানেই তাঁর দর্শককে তিনি টেনে নিয়ে গিয়ে একের পর এক উপহার দিয়েছেন ‘কাঁচের স্বর্গ, ‘পলাতক’, ‘সংসার সীমান্তে’, ‘বালিকা বধূ’, ‘কুহেলী’, ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘ফুলেশ্বরী’, ‘দাদার কীর্তি,’ ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’, ‘পরশমণি’ ও ‘আপন আমার আপন’এর মতো বিপুল বাণিজ্যিক সাফল্যের ছবি।

 

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close