কথা ও কাহিনীফিচার

বাবাকে নিয়ে একদিনের ‘আদিখ্যেতা’, সাংবাদিকের সামনে রেগে গিয়েছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণর কন্যা

রমেন দাস: মহালয়া এলেই মনে পড়ে। প্রত্যেক মুহূর্তে উঠে আসে তাঁর নাম। প্রতিনিয়ত হিল্লোল তোলে তাঁর কণ্ঠ। নিমেষেই এক দিনের একাকি আলোয় আলোকিত হন তিনি। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র! মহালয়া আর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র মহাকাব্যিক সুরে-সূত্রে প্রতিফলিত হয় তাঁর নাম। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের মহামায়া। যা বাঙালিকে, আপামর ভারতবর্ষের জাগিয়ে তোলে ফের। কিন্তু তার পর? একদিনেই শেষ সব? সেদিনই কি মনে রাখার জন্য তিনি?

আজ একটা অন্য কথা বলি। যা হয়ত গল্প হলেও সত্যি! জানেন না আপনি! ২০১৮ সাল। একটি তথাকথিত গ্রাউন্ড বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমে আগের বছর থেকে শুরু করেছি কাজ। পুজো আসছে। তোড়জোড় শুরু হয়েছে নিউজ রুমে। কাঁপা কাঁপা হাতে কপি লিখছি তখন, আজও যেমন করে রোজ শিখি, সে দিনও তাই-ই ছিল আমার সামগ্রিক অবস্থা। তখন ফিল্ড রিপোর্টে বেরোচ্ছি। এক দিন নির্দেশ এল, মহালয়া নিয়ে সবার থেকে আলাদা কিছু করার। কিন্তু কে করবেন? আমার সঙ্গেই কাজ শুরু করা করা এক সহকর্মীর (বর্তমানে পরিচিত মুখ) উপর দায়িত্ব পড়ল। ক্যাম-লুক (নিউজের ভাষায়) তাঁর খুবই ভালো। শুধু উচ্চারণে ভীষণ ত্রুটি। স আর শ-ক্ষেত্র বিড়ম্বনা দিতে থাকে রোজ। কিন্তু ছোট জায়গা, লোকবল কম। সেখানে যদি তাঁকে না পাঠানো হয়, পরের দিন তিনি আর কাজ করবেন না! এই চিন্তায় অগত্যা সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান তাঁকেই বললেন যেতে। কিন্তু… পরের দিন কাজ। অথচ নতুন কিছু করতে গিয়ে বেশ চাপে পড়লেন তিনি। এদিকে বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ার আমার কর্মজগতের প্রথম সহকর্মী বন্ধু বিধান রায় (অনুমতি নিয়েই নাম লিখলাম) নিজেও নিউজ রিডার ছিলেন তখন। ওঁ কেন জানি না সবসময় চাইত, সব ভালো ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ যেন আমিই করি। অবশেষে কর্মক্ষেত্রের একাংশের সহযোগিতায় অনেক ‘সুন্দর’দের অতিক্রম করেই সুযোগ পেয়েছিলাম রেডিওর ‘ভগবান’ অর্থাৎ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র-কে নিয়ে একটি কাজ করার। যা বোধহয় আমরাই প্রথম করেছিলাম। সেদিনই রাতে নিশ্চিত হল আমার নাম। খবর শুনেই ঝড়ের বেগে পড়তে থাকলাম সব, যা পেলাম। খানিকটা যেন পরীক্ষার আগের দিনের মতো!

মহালয়ার দিন সকালে এবং সন্ধ্যায় ১ ঘণ্টা ধরে এপিসোডটি দেখানো হবে। তাতে আমার কাজটি আধ ঘণ্টা চলবে। ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’র এবং রেডিওর জনপ্রিয়তা মূলত যার ‘কণ্ঠধরে’, সেই তাঁকেই অন্যভাবে তুলে ধরতে হবে, দেওয়া হল এই নির্দেশ। তার জন্য প্রয়োজন সেই মানুষটির বাড়িতে যাওয়া, আর অনেক পড়াশুনা করে যাওয়া। একমাত্র জীবিত কন্যা, যিনি অত্যন্ত রাগী, তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা। সেটাই এক্সক্লুসিভ হবে। যদিও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ‘অন্য কাউকে’ দিয়ে এই কাজটি করানো যায়, এমন চেষ্টা চললেও। সেটি আর হল না। অবশেষে একাধিক বাধা পেরিয়ে ‘মারাত্মক কঠিন’ এই কাজটি আমাকেই করতে হবে। কারণ হিসেবে আমাকে বলা হল, যাঁর করার কথা ছিল সে নাকি আয়ত্ত করতে পারেননি বিষয়টি। বড্ড অভিমান হল সেদিন। বয়েস তখন বেশ কম। নতুন, এখনও নতুনই রয়েছি যদিও। তবুও, এত ভালো কাজ হাতছাড়া করব?

নাহ্! সম্মতি দিলাম অনেক ভেবেই। অনেক রাত হয়েছে। দ্বিধাগ্রস্থ হয়েই আমার সবচেয়ে কাছের শিক্ষকদের ফোন করলাম। বারাসত সরকারি কলেজের বাংলার অধ্যাপক পারমিতা ভট্টাচার্য, কিশলয় জানা, তারপর ফোন করলাম বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক, একদা বিভাগীয় প্রধান মলয় রক্ষিতকে। স্যর, বিরক্ত তো হলেনই না, উপরন্তু স্বল্প সময়েও কী কী করা যায়? সময় আর পথ বাতলে দিলেন আমাকে। ছবি, নিউজ লিঙ্ক, পিডিএফ-ও পাঠালেন কিছু লেখালেখির, দেখালেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণের লেখা। ফেসবুকে, গুগলে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকলাম। ইউটিউবে মোটামুটি যা পাচ্ছি দেখতে থাকলাম। ফেসবুক গ্রুপ ‘মলাট’ থেকে ডেটা, পিডিএফ নিলাম। সারা রাত, এমনকি পরদিন সকাল ৮ পর্যন্ত পড়তে থাকলাম। জেদ ছিল কাজটা ভালো করতেই হবে! একপ্রকার পশুর মতো আয়ত্ত করতে চেয়েছিলাম সব। তারপর অফিস গিয়ে, ১২টা নাগাদ পৌঁছলাম উত্তর কলকাতার সেই স্বর্গে। সমগ্র জীবন শুনতে শিখেছি যাঁর কাছে, সেই মানুষটির বাড়ি।

প্রথম থেকেই দারুণ সাহায্য করছিলেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের এক কন্যার পুত্র, তাঁর দৌহিত্র শোভনগোপাল দত্ত, বর্তমানে তিনিও প্রয়াত। তিনি শোনালেন অনেক কিছু। আমাকে যেন বুঝিয়ে দিলেন অনেকটাই। সব শুনতে শুনতে কেমন যেন ঘোর ঘোর মনে হচ্ছিল সেদিন। আমার সঙ্গেই ছিলেন চিত্র সাংবাদিক প্রদীপ। ওঁর সঙ্গে কত মনোমালিন্য হয়েছে কাজের সূত্রে। কিন্তু ওই দিন ওঁ না থাকলে কোনওটাই ঠিকঠাক হত না। আমি কেমনভাবে হাঁটব সেটাও ওঁর দেখানো। আর ভিডিও এডিটর, সব ত্রুটি লুকিয়ে রেখেছিলেন, তাঁর অনবদ্য গুণে।

বনেদি বাড়ির বাইরে একটা স্টার্ট পিটিসি (সূচনা) দেওয়ার পর, সিড়ি বেয়ে উঠতে থাকলাম। শোভনবাবু দেখালেন, কাজী নজরুল ইসলাম এসে কোথায় বসেছিলেন, সেই জায়গা। কেমন যেন প্রত্যেক সিড়িতেই লুকিয়ে রয়েছে ইতিহাস। আর বেদনা? জুতো খুলে প্রবেশ করলাম সেখানে।

তার পর সেই মুহূর্ত। একটি ঘর। কাঠের পুরনো খাট। কিছু বই রাখা তাতে। এই খাটেই নাকি থাকতেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। প্রদীপ যা যা ছবি নেওয়ার নিলেন, বেশ অনেক্ষণ ধরে। যখন সব কিছু নিয়েই হতাশা-সহ শেষ চেষ্টা করতে গেলাম, ইচ্ছা হল তাঁর একমাত্র জীবিত কন্যা অশীতিপর সুজাতা দেবীর সঙ্গে কথা বলব! তখনই যেন বিস্ফোরণ ঘটল ফের!

তিনি মারাত্মক রেগে গিয়ে বললেন, ”আমি তো বলে দিয়েছি কারওর সঙ্গে কোনও কথা বলব না, কথা বলে কী হবে? একদিনের আদিখ্যেতা করে লাভ নেই।” শোভনবাবু বোঝাতে গিয়েও ব্যর্থ হলেন। প্রদীপ বলেই দিলেন ইশারায়, ‘চল অফিস’! আমি অবাক! তাহলে কি সব প্রচেষ্টায় জল! কী হবে এবার! সত্যিই তো, ‘বীরূপাক্ষ’ তাঁর খাতায় যা যা বলে গিয়েছেন বারবার, সবটাই যে সত্যি! মনে হল, সেই সত্যতাই যেন এখনও হাতড়ে বেড়াচ্ছেন তাঁর কন্যা! দুঃখ, বেদনায় জর্জরিত হৃদয়ে তিনিই যেন বলে চলেছেন সবটা! শেষ চেষ্টা করলাম। সাহস নিয়ে এগিয়ে গেলাম তাঁর কাছে। বললাম, ”আমি নতুন, অনেকটা জেনে আসার চেষ্টা করেছি, রাতে ঘুমোতে পারিনি। আপনি যদি ফিরিয়ে দেন, আমার কর্মের আগামীতে খুব একটা ভালো আর হবে না! দয়া করুন!” চুপ করে রইলেন তিনি। খানিকক্ষণ পরে আমায় ডেকে বললেন, “বেশি নয়। নাও (সাক্ষাৎকার) অল্প সময়!” সেদিনের সেই সুজাতা ভদ্র রাজি হলেন। আজ তিনিও প্রয়াত।

ক্যামেরা চলল। যে মানুষটি ১ মিনিটও কথা বলতে চাইছিলেন না, তিনিই জানালেন কত অজানা স্মৃতি। সময় কাটল। ফ্যান বন্ধ, অতিরিক্ত শব্দ আসবে বলে। তবে তিনি বলেই চললেন নিরন্তর! কত কষ্টের কথা! তাঁর বিখ্যাত পিতার করুণ কাহিনি, সুখের তুলনায় দুঃখ যাপন করলেন বেশি! অভিমানের কথা। তাতে সুখের কিছু ছিল বলে আমার সত্যিই মনে হয়নি সেদিন! পরে সিনেমার পর্দায় ‘মহালয়া’ দেখেও একই লেগেছিল প্রায়।

বহুল প্রচলিত ‘নাস্তিক’ বীরেন্দ্রকৃষ্ণের অর্থাৎ তাঁর বাবার স্নান করে রেডিওর অফিসে যাওয়া, পরিষ্কার কাপড়, ধূপ দেওয়া! একটা সময় রেডিও থেকে বিতাড়িত হওয়া, উওমকুমার প্রসঙ্গ। ধারের জীবন, মারাত্মক কষ্টের দিনযাপন। দারিদ্র্যতা… সবকিছু বলছিলেন তিনি। এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছিল, একাধিকবার রেকর্ড বন্ধ রাখছিলাম আমরা। বারবার আবেগে আর অভিমানে বিধ্বস্ত হচ্ছিলেন সুজাতা দেবী।

আমি নতুন। সবে হাতেখড়ি। অভিজ্ঞরা আরও ভালো বুঝবেন। কিন্তু এইটুকু নিশ্চিতভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলাম, সৃষ্টিকর্তাও কেমনভাবে বিতাড়িত হতে পারেন রোজ। একটা মানুষ, যে রেলের নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে রেডিওয় আসেন। যাঁর কণ্ঠ এখনও শিহরণ জাগায়, এখনও বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের আবহ আনে বারবার, তাঁর সংসারও উৎসবহীন হতে সময় লাগেনি সেদিন। ক্ষুধা আর সন্তানের অন্ন জোগানে লড়াই করেছেন তিনিও!

এইসব উপলব্ধি থেকেই হয়ত সুজাতা দেবী আমাকে সেদিন বলেছিলেন, ”একদিনের আদিখ্যেতা করতে হবে না!” যদিও সাক্ষাৎকারের শেষে যখন আমি আর প্রদীপ পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিলাম তাঁকে, তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি এত পড়েছ? আমার বাবার সত্যি ভক্ত তুমি?’ আমি শুধু বলেছিলাম, ”আপনার বাবাকে তো ছোটবেলায় ভাবতাম ভগবান, মা বলতেন রাত থাকতে উঠবি, রেডিও শুনবি নইলে ‘পাপ’ হবে।” হেসে ফেলেছিলেন বীরেন্দ্র-কন্যা।

আসলে হয়ত সৃষ্টিকর্তাই তাঁর অন্তরের প্রকাশ করতে পারেন, বলতে পারেন এক অমোঘ সৃষ্টির কথা, ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’র কথা। উদাত্ত কণ্ঠে জাগিয়ে তুলতে পারেন আপামর বাঙালিকে! আর শেষ জীবনের বিস্মৃতি নিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন পরিবার, সন্তানদের। যাঁরা বিখ্যাত পিতার মৌলিকতায় ভর করে প্রবল ভিড়েও যেন উদাত্ত কণ্ঠে বলতে পারেন, একদিন নয় আমাদের বাবা আসলে চিরন্তন!

(এটি শুধুই এক অজানা সত্য, আর অভিজ্ঞতার মিশেলে একটি প্রতিবেদন। আমার কর্মের নীতিগত অবস্থানে দাঁড়িয়ে সেই সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত প্রকাশ, শুধুমাত্র সেই বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমের অধিকার, আমার নয়।)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close