খবর

হিসেবে ‘গোঁজামিল’, ‘ প্রিন্টার বিতর্কে’ প্রিয়মকে সরানো হলো ব্লাডমেটস থেকে

মহানগর বার্তা ডেস্ক: প্রিন্টার বিতর্কে শোরগোল পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। একের পর ট্রোল, মিমে জেরবার হয়েছিল ফেসবুক। রক্ত সংক্রান্ত কাজ করে এমন এক সংগঠন ব্লাডমেটসের খোদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উঠেছিল হিসেবে গরমিলের অভিযোগ। আর যে অভিযোগ করা হয়েছিল ওই সংগঠনের ট্রাস্টি সদস্যদের তরফে। বিস্তারিত অভিযোগ নিয়ে করা হয় ফেসবুক পোস্ট। যদিও তার প্রতিক্রিয়ায় একাধিক ফেসবুক পোস্ট করেন প্রিয়ম নিজেও। তিনি জানান, টাকা তোলা এবং খরচের বিষয়ে! কিন্তু এবার সেই কাণ্ডেই নড়েচড়ে বসল ওই সংগঠন। অবশেষে বর্তমান চেয়ারম্যান প্রিয়ম সেনগুপ্তকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল ব্লাডমেটস্। সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে সরে যাওযার কথা বলা হয়েছে ট্রাস্টি সদস্যদের তরফ থেকে।

রবিবার ১৬ অক্টোবর, ২০২২ তারিখে ওই সংগঠনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট করে জানানো হয়েছে যে, ”ট্রাস্টিবোর্ড প্রিয়ম সেনগুপ্তকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে অপসারণের এবং তাঁর সঙ্গে ব্লাডমেটসের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। …তাঁকে নোটিশ পিরিয়ডের সময় দেওয়া হবে এবং সেই সময়ে তাঁর সমস্ত ক্ষমতা অপসারণ করা হবে।”

এই প্রসঙ্গে মহানগর বার্তার তরফে যোগাযোগ করা যায়, ওই সংগঠনের বর্তমান এক ট্রাস্টি সদস্যের সঙ্গে। অমিত মাইতি আমাদের জানান, “প্রিয়ম সেনগুপ্তকে আপাতত চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে পুরো অপসারণের ক্ষেত্রে। সেগুলো দেখা হচ্ছে। আস্তে আস্তে সেগুলো হবে। তবে ট্রাস্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওঁ আর চেয়ারম্যান নেই।”

ওই ফেসবুক পোস্টে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। সমস্ত বিষয়ে খুঁটিনাটি তুলে ধরে কেন এই সিদ্ধান্ত, তাও বলা হয়েছে। হুবহু সেই ফেসবুক পোস্ট আমরা এখানে তুলে দিলাম;

‘#ট্রাষ্টিবোর্ড_অ্যানাউন্সমেন্ট

গত ১৯ অগস্ট ২০২২ ব্লাডমেটসের চেয়ারম্যান শ্রী প্রিয়ম সেনগুপ্ত তাঁর নিজস্ব ফেসবুক ওয়ালে ব্লাডমেটসের হ্যাশট্যাগসহ ব্লাডমেটসের জন্য একটি প্রিন্টার কিনবেন বলে অর্থসাহায্য চেয়ে পোস্ট করেন। ওই সময়ে ব্লাডমেটসের ট্রাস্টিবোর্ডের সদস্য ছিলেন – প্রিয়ম সেনগুপ্ত (চেয়ারম্যান), সৌম্যদেব রায় চৌধুরী, অমিত মাইতি। পোস্টটি করার সময় সৌম্যদেব চেয়ারম্যানের সাথেই ছিল এবং জানত যে ক্রাউড ফাণ্ডিং এর পোস্ট করবেন। তবে চেয়ারম্যান অফিসিয়াল নোটে ট্রাস্টি গ্রুপে কিছু না জানিয়ে এবং অপর ট্রাস্টি অমিতকে অন্ধকারে রেখে এই পোস্ট করেন।

এই সময় ব্লাডমেটসের অ্যাকাউন্টে কেওয়াইসি পেণ্ডিং ছিল তাই তাতে টাকা ঢুকলেও তা তখনই উইথড্র করা যেত না। চেয়ারম্যান তাই ব্লাডমেটসের অ্যাকাউন্ট ডিটেল পোস্টে দেননি। ইনফ্যাক্ট তিনি কোনও অ্যাকাউন্ট ডিটেলসই পোস্টে দেননি। যাঁরা ডোনেশন দেবেন বলে কমেন্ট করেন তাঁদের ইনবক্সে গিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর চেয়ে একটি গ্রুপে অ্যাড করে সেখানে নিজের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী দীপ করের জিপে/ফোনপে নম্বর দেন। দীপ ব্লাডমেটসের মেম্বার নন। এবং এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের কথা বাকি ট্রাস্টিরা কেউ ঘুণাক্ষরেও জানতেন না। সেদিনই ওই টাকা যায় রাহুলের (ব্লাডমেটস থেকে বহিষ্কৃত) অ্যাকাউন্টে এবং সেখান থেকে যায় সংকেতের (ব্লাডমেটসের কোর কমিটি সদস্য) অ্যাকাউন্টে। রাহুলের অ্যাকাউন্ট ঘুরে এই টাকা যে এভাবে সংকেতের কাছে এসেছে তা অন্য ট্রাস্টিরা কেউ জানত না। ওই রাতেই সংকেতের অ্যামাজন অ্যাকাউন্ট থেকে প্রিন্টার অর্ডার হয়ে যায়।

পরবর্তী কালে অডিটের হিসেব করার উদ্দেশ্যে ট্রাস্টিরা প্রিন্টারের বিল এবং কারা কারা কত ডোনেশন দিয়েছে তার হিসেব চায় চেয়ারম্যানের কাছে। এই সময়েই দু’বার দু’রকম হিসেব দেন চেয়ারম্যান ট্রাস্টিদের কাছে এবং তাতে অস্বচ্ছতা ও অসঙ্গতি পাওয়া যায় আর তার নিরিখেই ১৪ অক্টোবর, ২০২২ বর্তমান ট্রাস্টিদের পক্ষ থেকে পেজে অ্যাপলজি পোস্ট যায়। অনেকেই ১৪ অক্টোবর করা অ্যাপলজি পোস্টে জানতে চেয়েছিলেন যে অগস্ট মাসে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে দু’মাস পরে কেন অ্যাপলজি চাওয়া হলো। আসলে এখন যখন অডিটের কাজ করার জন্য নথি, ট্রান্সাকশন ডিটেল চেয়ারম্যানের কাছে চাওয়া হয় তখন দেখা যায় যে উনি উদ্বৃত্ত টাকা কাউকে কিছু না জানিয়েই খরচ করেছেন বিভিন্ন খাতে এবং খরচের হিসেবেও কিছু অসঙ্গতি আছে। বর্তমান ট্রাস্টিবোর্ড সম্পূর্ণ ব্যাপারটি সম্পর্কে চার-পাঁচদিন আগে অবগত হয়েছে এবং প্রামাণ্য নথি ও ডিটেলস চেক করে অস্বচ্ছতা ও অসঙ্গতির ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যত দ্রুত সম্ভব পেজ থেকে অ্যাপলজি চেয়েছে।

এবার আসি চেয়ারম্যানের দেওয়া হিসেবের প্রসঙ্গে।
ট্রাস্টিদের কাছে প্রথম দফায় চেয়ারম্যান হিসেব দেয়:

উঠেছে ২৯৫০০ টাকা
প্রিন্টার ১৯৬৯৯ টাকা
বাকি টাকা যাঁরা ডোনেট করেছিলেন তাঁদের সম্মতিক্রমে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে ডোনেট করেন-

১। ৫০০ টাকা হিন্দু সংহতি নেতা সুমন্ত্র মাইতির বস্ত্রদান অনুষ্ঠানে
২। ১০০০ টাকা মৌসুমী বাগকে আগামী ২৫ ডিসেম্বর ফসিলস্ ফোর্সের কোনও কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে।
৩। বাকি টাকা তিনি জানান ঝাড়গ্রামে বাচ্চাদের খাওয়ানো, জামা কাপড়ের উদ্দেশ্যে দিয়েছিলেন।

ট্রাস্টিরা এই ২৯৫০০ টাকার নথি ডিটেলে দেখতে চাইলে ডোনেশনের স্ক্রিনশট (দীপের থেকে) দেয় চেয়ারম্যান। তাতে দেখা একই লোকের দেওয়া ৫৫০০ টাকার স্ক্রিনশট দুবার ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ আসলে টাকা উঠেছে ২৪০০০।

এই অসঙ্গতি পাওয়ার পর ট্রাস্টিরা চেয়ারম্যানকে বলে দীপের থেকে অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট নিয়ে জমা করতে। চেয়ারম্যানের প্রস্তাব অনুসারে ও বাকি ট্রাস্টিদের সম্মতিক্রমে এবং এই স্টেটমেন্ট খতিয়ে দেখার জন্য ইন্টার্নাল অডিটর শান্তনুকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই হিসেব নিম্নরূপ:

১। উঠেছে ৩২০০০ টাকা।
২। প্রিয়ম সেনগুপ্ত মুকুলিকা নামক একজনের থেকে ৫৫০০ টাকা পেতেন সেটা ঘটনাচক্রে একইসময়ে দীপের অ্যাকাউন্টে ঢোকেন অর্থাৎ প্রিন্টারের ডোনেশন বাবদ উঠেছিল ২৬৫০০ টাকা।

এবার এই ২৬৫০০ র খরচ চেয়ারম্যান নিম্নরূপে দেন:

১। ১৯৬৯৯ টাকা প্রিন্টার বাবদ খরচ হয়েছে।
২। ৪০০০ টাকা ঝাড়গ্রামের বাচ্চাদের জন্য অভিজিৎ নামক কারোর অ্যাকাউন্টে সংকেতের অ্যাকাউন্ট থেকে পাঠানো হয়। মধুরিমা রায়কে ৭০০ টাকা দেওয়া হয়েছে ঝাড়গ্রামের অনুষ্ঠানের লজিস্টিকাল অ্যাসিস্ট্যান্সের জন্য।
৩। মালদায় রক্তে রকের মিটিং এ জুলাই মাসে, যাতায়াতের জন্য চেয়ারম্যানের ট্রান্সপোর্টেশান অ্যালাওন্স বাবদ ৫০০ টাকা।
৪। ৫০০ টাকা হিন্দু সংহতি নেতা সুমন্ত্র মাইতির বস্ত্রদান অনুষ্ঠানে
৫। ১১০১ টাকা মৌসুমী বাগকে আগামী ২৫ ডিসেম্বর ফসিলস্ ফোর্সের কোনও কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। (ট্রান্সাকশন ডিটেলসে দেখা যাচ্ছে ১০০০ টাকা মৌসুমী বাগকে পাঠানো হয়, ১১০১ নয়)* মৌসুমী বাগ কে করা ট্রানজ্যাকসনে অরিঘ্ন বলে একজনের নাম এখানেও ধোঁয়াশা।

চেয়ারম্যানের দেওয়া হিসেবে অস্বচ্ছতা ও অসঙ্গতি দেখে ট্রাস্টিরা সরাসরি সংকেতের থেকে ট্রান্সাকশন ডিটেলস্ চায়। সেখান থেকে পাওয়া যায়:

রাহুলের থেকে ২৯৫০০ টাকা সংকেত পেয়েছে এবং চেয়ারম্যানের নির্দেশে খরচ করেছে নিম্নরূপে:

১। ১৯৬৯৯ টাকা প্রিন্টার বাবদ
২। ৪০০০ টাকা ঝাড়গ্রামের বাচ্চাদের জন্য অভিজিৎ নামক কারোর অ্যাকাউন্টে সংকেতের অ্যাকাউন্ট থেকে পাঠানো হয়।
৩। মধুরিমা রায়কে ৭০০ টাকা দেওয়া হয়েছে ঝাড়গ্রামের অনুষ্ঠানের লজিস্টিকাল অ্যাসিস্ট্যান্সের জন্য।
৪। মালদায় রক্তে রকের মিটিং এ জুলাই মাসে, যাতায়াতের জন্য চেয়ারম্যানের ট্রান্সপোর্টেশান অ্যালাওন্স বাবদ ৫০০ টাকা।
৫। ১০০০ টাকা মৌসুমী বাগকে এবং ৩০০০ টাকা রাহুলকে অর্থাৎ মোট ৪০০০ টাকা আগামী ২৫ ডিসেম্বর ফসিলস্ ফোর্সের কোনও কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে।
৬। ৭৭৫ টাকা লিকার শপে পেমেন্ট করতে বলে ১৬ সেপ্টেম্বর তারিখে। ট্রাস্টিবোর্ডের তরফে যখন ১০  অক্টোবর হিসেব চাওয়া হয় তারপর ১১ অক্টোবর চেয়ারম্যান সংকেতকে পিএম করে জানান যে মদের টাকা তিনি দিয়ে দেবেন। যদিও এটা তাঁর আগে মনে হয়নি। হিসেব চাওয়ার পর টনক নড়ে। এবং এই কথাও সংকেতকে বলেন যে “তাহলে একটা গোঁজামিল হিসেব করতে হবে। হিসেব মেলানোর জন্য।”* এক্ষেত্রে সংকেত জানিয়েছে চেয়ারম্যান তাকে গোঁজামিল দিয়ে হিসেব মেলানোর জন্য প্রভাবিত করেছে, কিন্তু সে ট্রাস্টিবোর্ডের কাছে সততার পরিচয় দিয়েছে।

অতএব সমস্তটা খতিয়ে দেখা যাচ্ছে:

১। জনগণের টাকা ক্রাউড ফাণ্ড করে তা চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত বিনোদনে ব্যবহার করেছেন কাউকে না জানিয়েই এবং তারপর যখন প্রায় একমাস পরে হিসেব চাওয়া হয়েছে তখন তিনি বলেছেন ওই টাকা তিনি ফিরিয়ে দেবেন। অথচ কেন তিনি এই কাজ করেছিলেন তার সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

২। উপরন্তু এই প্রমাণও রয়েছে যে তিনি সংকেতকে বলছেন যে গোঁজামিল দিয়ে হিসেবটা মিলিয়ে দেওয়ার কথা বলে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, যে চেয়ারম্যান নিজেই হিসেবে গোঁজামিল দিতে বলে তার এই পদে থাকার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

৩। চেয়ারম্যান রক্তে রকের কাজে মালদা গিয়েছিলেন জুলাই মাসে অথচ তাঁর দেওয়া প্রথম হিসেবে মালদার টিকিটের কোনও উল্লেখই নেই। যদিও হিসেব না মেলায় পরের দফার হিসেবে তিনি মালদার টিকিটের খরচ অ্যাড করেন। আগস্ট মাসে তোলা ফাণ্ড থেকে জুলাই এর ব্যাকডেটের খরচ মিলিয়েছেন। ট্রাস্টিবোর্ডের আশঙ্কা যে হিসেব মেলানোর জন্য এখানেও গোঁজামিলের আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

৪। উনি নিজেই ব্লাডমেটসের ইন্টার্নাল গ্রুপে স্বীকার করেছেন যে তিনি নাকি ব্লাডমেটসের জন্য ক্রাউড ফাণ্ডিং কে ভুল করে ব্যক্তিগত ক্রাউড ফাণ্ডিং ভেবেছিলেন এবং সেই জন্য তিনি প্রিন্টার কেনার পর বাকি টাকাটা নিজের একক সিদ্ধান্তে বিভিন্ন জায়গায় অনুদান হিসেবে ও ব্যক্তিগত বিনোদনে খরচ করেছেন। যে চেয়ারম্যান এমন গুরুতর ভুল করে তার চেয়ারম্যান কেন ট্রাস্টিবোর্ডেও থাকার যোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়।

৫। উল্লেখযোগ্য যে, যে টাকার অঙ্ককে তিনি ব্লাডমেটসের নয় বরং নিজের ব্যক্তিগত ক্রাউড ফাণ্ডিং ভেবেছিলেন বলে নিজ মুখে স্বীকার করেছেন সেই টাকার হিসেব মেলানোর জন্য তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে সংগঠন থেকে প্রাপ্য ট্রান্সপোর্ট অ্যানাওন্স হিসেবে দর্শিয়েছেন। অর্থাৎ হিসেব মেলানোর জন্য তিনি নিজেই নিজেকে কনট্রাডিক্ট করেছেন।

৬। প্রিন্টারের জন্য যাঁরা ডোনেশন দেবেন বলেছিলেন তাঁদের নিয়ে যে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ গঠন করা হয় তাতে বাকি ট্রাস্টিরা কেন ছিল না বা তার কথা চেয়ারম্যান কেন আর কোনো ট্রাস্টিকে জানাননি তা নিয়েও চেয়ারম্যান কিছু বলেননি। উপরন্তু জানা গেছে যে যারা ডোনেশন দিয়েছেন তাদের কাউকে কাউকে ওই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অ্যাড করলেও সকলকে অ্যাড করেননি। অর্থাৎ সামগ্রিক কর্মপদ্ধতিতেই কোনও স্বচ্ছতার অভাব।

৭। চেয়ারম্যান বলেছেন যে প্রিন্টার কেনার পর উদ্বৃত্ত টাকা তিনি অন্যান্য সমাজসেবামূলক কাজে অনুদান হিসেবে যে দিয়েছেন তা নাকি যাঁরা ডোনেট করেছেন তাঁদের অনুমতি নিয়েই। কিন্তু এই কথাটিও সম্পূর্ণ সত্য নয়। তিনি সকল ডোনারের থেকে অনুমতি নেননি বা জানানওনি যে ফাণ্ড উদ্বৃত্ত। সামগ্রিকভাবে এই মিথ্যচআরগুলো ট্রাস্টের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখেই ঠেলে দিয়েছে।

৮। ডোনেশনের টাকা দীপের অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি সংকেতের কাছে গেলে তাতে হিসেব করা সহজতর হতো। তা না করে এক তৃতীয় ব্যক্তির ভায়া করে কেন তা পাঠানো হলো, বিশেষত যখন সেই ব্যক্তি পূর্বেই অভিযোগের ভিত্তিতে সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত? এর উত্তর স্বরূপ তিনি বলেছেন যে তিনি ইনটক্সিকেটেড অবস্থায় এই কাজ করে ফেলেছেন। টাকা যত হাত ঘোরে তত হিসেবে জটিলতা তৈরি হয়। সংগঠনের মুখপাত্র হয়ে তিনি ইনটক্সিকেটেড অবস্থায় পাবলিক ফাণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সেন্সিটিভ বিষয়ে ব্লাডমেটসকে এই অযাচিত জটিলতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন। মানুষের বিশ্বাসকে মূলধন করে চলা একটা সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এতে নষ্ট হচ্ছে।

৯। সৌম্যদেব রায় চৌধুরী (ট্রাস্টি) এই প্রিন্টারের জন্য ক্রাউড ফাণ্ডিং এর পোস্ট হওয়া এবং দীপ করের অ্যাকাউন্টে টাকা তোলার ব্যাপারে জানলেও তা তিনিও অপর ট্রাস্টি অমিতকে জানাননি এবং ডোনেশনের ট্রান্সাকাশন ডিটেল চেয়ারম্যানের থেকে চাইতে তিনি ডিলে করেন। সৌম্যদেবের দিক থেকে এই ব্যাপারে গাফিলতি হয়েছে এবং তিনি তা স্বীকারও করেছেন এবং তিনি বলেছেন যে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে বোর্ডের তরফ থেকে যে শাস্তি দেওয়া হবে তা তিনি মেনে নেবেন।

১০। অমিত মাইতি (ট্রাস্টি) প্রিন্টারের জন্য পোস্ট দেখেও তখন জানতে চাননি যে কোন অ্যাকাউন্টে টাকা তোলা হচ্ছে বা ডোনেশনের ট্রান্সাকশন ডিটেলও তিনি দেখতে চাননি। এখানে তার দিক থেকেও কিছুটা গাফিলতি আছে। অমিতকে ওয়ার্ন করা হচ্ছে ভবিষ্যতে তিনি যদি আবারও এই ধরণের কোনও গাফিলতি দেখান তবে তাঁর বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে ট্রাস্টিবোর্ড মনে করছে যে চেয়ারম্যানের বারংবার হঠকারিতা, বোর্ডকে না জানিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে বারংবার একক সিদ্ধান্ত নেওয়া (বোর্ড গঠন হওয়ার পর থেকেই এই ট্রেণ্ড চলে আসছে, এমন নয় যে জাস্ট এবারেই ভুল হয়ে গেছে), ট্রাস্টের নাম করে পাবলিক ফাণ্ড তুলে তাকে ব্যক্তিগত ফাণ্ড ভেবে নিজের বিনোদনে খরচ করা এবং হিসাব মেলাতে না পারলে গোঁজামিল দিয়ে হিসেব মেলানোর চেষ্টা, ইনটক্সিকেটেড অবস্থায় ক্রাউড ফাণ্ডিং এর পোস্ট করা যথেষ্ট গুরুতর অভিযোগ এবং যখন সংগঠনের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ উঠছে তখন সামগ্রিকভাবে সংগঠনের ক্ষতি হচ্ছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত ক’দিন ধরে একাধিক বার প্রিন্টার কেনার জন্য ডোনেশনের অ্যামাউন্ট দিয়ে প্রিন্টার কেনার পর উদ্বৃত্ত টাকার খরচের হিসেব মেলাতে ব্যর্থ হয়ে গতকাল রাতে উদ্বৃত্ত ৬৮০১ টাকা (তিনটে মিটিংয়ের পর যদিও দ্বিতীয় মিটিংয়ে ঠিক হয়নি কিভাবে পাঠাবে) ট্রেজারি সৌম্যদেবের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেছেন যা সৌম্যদেব প্রোপার প্রসেসে ব্লাডমেটসের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেবে। এখন ওই উদ্ধৃত টাকার খরচ ওর ব্যক্তিগত, কিন্তু বারবার ট্রাস্টিবোর্ডের কাছে হিসেবের অসঙ্গতি ওপরে দেওয়া থাকলো।

সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়ম মেনে কাজ না করার জন্য প্রিয়ম সেনগুপ্তের সঙ্গে ব্লাডমেটসের সমস্ত রকম সম্পর্ক ছিন্ন করাই সমীচিন মনে করছেন সংগঠনের ট্রাস্টিরা ও অনেক সাধারণ সদস্য এবং তাই ট্রাস্টিবোর্ড প্রিয়ম সেনগুপ্তকে চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণের ও তাঁর সঙ্গে ব্লাডমেটসের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে যেহেতু উনি ট্রাস্টের সেটলার তাই ওঁর বহিষ্কারের ক্ষেত্রে কিছু আইনি জটিলতা আছে। আমরা ট্রাস্টিবোর্ডের তরফ থেকে অবগত করছি ট্রাস্টি বোর্ড এবং ইনর্টানাল অডিটর এর সমক্ষে যে মিটিং হয় সেখানে ট্রাস্টি বোর্ডের কোড অব কনডাক্ট অনুযায়ী চেয়ারম্যানের পদত্যাগ এর দাবি ওঠে এবং তিন জন ট্রাস্টি এর পক্ষে ভোট দেয় এবং নিয়মানুযায়ী চেয়ারম্যান এর পদ থেকে প্রিয়ম সেনগুপ্ত পদত্যাগ শিকার করেন, অফিসিয়ালি তাকে নোটিশ পিরিয়ড এর টাইম দেওয়া হবে এবং সেই সময় তার সমস্ত ক্ষমতা অপসারণ করা হবে। এরমধ্যে নতুন ট্রাস্টি ও চেয়ারম্যান বেছে নিয়ে সংগঠনের কার্যকারী কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। প্রিয়ম সেনগুপ্তকে দ্রুত পদত্যাগ পত্র জমা দিতে হবে।

ব্লাডমেটস অতীতেও যেমন মানুষের পাশে থেকেছে রক্তের প্রয়োজনে, ভবিষ্যতেও তেমনটাই থাকবে। আপনারা যাঁরা এতোদিন আমাদের পাশে থেকেছেন, ব্লাডমেটসের এই পুনর্গঠনের  অধ্যায়ে আশা করি আমাদের সেই সব শুভাকাঙ্ক্ষী ও রক্তদাতারা আমাদের পাশে থেকে সহযোগিতা করবেন।

পুনশ্চ: এতো কিছু খতিয়ে দেখে সবটা সামনে আনতে একটু সময় লাগল। কোর কমিটি সদস্যদের অনেকেই ইন্টার্নাল ম্যাটার প্রকাশ্যে আনতে গররাজি ছিলেন কিন্তু আমরা পুরোটা বারবার খতিয়ে বিচার করে প্রকাশ্যে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি যেহেতু ব্যাপারটা ক্রাউড ফাণ্ড নিয়ে ঘটেছে। আর তাছাড়া ট্রাস্টিবোর্ডের সদস্যদের না জানিয়ে বারংবার বিভিন্ন অনিয়ম করে কাজ করার এই ভয়ানক স্বৈরাচারী প্যাটার্ন নতুন নয়। তাই বাধ্য হয়েই সমস্তটা সামনে আনা হলো কারণ যাঁরা আমাদের বারবার ভরসা করেছেন আমরা তাঁদের প্রতিও দায়বদ্ধ।

ধন্যবাদান্তে,
অমিত মাইতি
সুমিত মিত্র
সৌম্যাদেব রায় চৌধুরী
(বর্তমান ট্রাস্টিবোর্ড)’

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close