ফিচার

পরীক্ষায় টুকলি করলে হতে পারে হাজতবাস, গেরুয়া শাসনে ভয় ধরিয়েছিল যে আইন

১৯৯২ সালের কথা। উত্তরপ্রদেশের আনাচে-কানাচে তখন টুকলি মাফিয়াদের বাড়-বাড়ন্ত। স্কুলের বোর্ড পরীক্ষা হোক কিংবা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা, সবেতেই কব্জা করে বসতো টুকলি মাফিয়ার দল। এমনকি তৎকালীন উত্তরপ্রদেশে চাকরির পরীক্ষাগুলোতেও টুকলির রমরমায় মুখ পুড়ছিল রাজ্যের। প্রশ্ন জাল করে ছেপে দেওয়া, প্রশ্নপত্র ফাঁস করা, প্রশ্নের চিট পরীক্ষা হলে কারসাজি করে পাঠিয়ে দেওয়া- উত্তরপ্রদেশের এই ছবি তখন মামুলি ঘটনা। আজকের যোগী রাজ্যে সেই সময় ছিল উত্তরপ্রদেশে কল্যাণ সিং -এর সরকার। আর তাঁর ক্যাবিনেটের অন্যতম সদস্য তথা শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন রাজনাথ সিং। যিনি বর্তমান সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। কল্যাণ এবং রাজনাথ মিলে তৎপর হলেন এই টুকলির দৌরাত্ম্য ঠেকাতে। রাজ্য বিধানসভায় বিরোধীদের প্রবল সমালোচনা সহ্য করেও আনা হলো নতুন আইন। যা ‘অ্যান্টি কপিং অ্যাক্ট ১৯৯২’ বলে পরিচিত।

এই আইনের জেরে ঘুম ছুটলো টুকলি মাফিয়াদের। কারণ এদের বেশিরভাগজনই ছিলেন শিক্ষাক্ষেত্রের বিভিন্ন পেশার সাথে জড়িত। শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক, বোর্ডের কোন সদস্য, স্কুল কলেজের স্টাফ, অফিসার- এরাই অর্থের লোভে এই কর্মকান্ডে সামিল হত। এই আইনের জেরে চাকরি চলে যাওয়ার ভয় তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা ছাড়াও সেই সময় কল্যাণ সিং এর সরকারকে এই আইন প্রণয়নে সাহায্য করেছিলে তাঁর একজন সরকারি আমলা। নাম, সুরিয়া (সূর্য) প্রতাপ সিং। তিনি ছিলেন একজন সিনিয়র আইএএস অফিসার। মিচিগন্ স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট। তবে তার পরিচিতি VAST নামে। অর্থাৎ,’voluntary action for social transformation’। টুকলি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে তিনি একটি এনজিও গড়ে তুলেছিলেন। এই এনজিওর সদস্য হিসেবে ছিল শিক্ষার্থীরাই, যারা টুকলিহীন স্বচ্ছ পরীক্ষার পক্ষে ছিল। টেলিগ্রাফের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তৎকালীন সময়ে যখন উত্তরপ্রদেশে বোর্ড পরীক্ষাগুলি হত তখন এই আইএস অফিসার পরীক্ষা হলে ভিডিওগ্রাফির মাধ্যমে নজর রাখতেন। তাঁর বক্তব্য শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম কখনই মানা যায় না। সুরিয়া প্রতাপ সিং ২০১৪-র বোর্ড পরীক্ষা নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, “৬৫ লাখ ছাত্রছাত্রী এবারের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো তাদের মধ্যে ৮০% পরীক্ষার্থী সফলভাবে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে। এই পরীক্ষার্থীরাই টুকলি মাফিয়াদের অস্বাস্থ্যকর ছায়া থেকে নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে বাঁচিয়েছে।” তার মতে ওই সময়ে “উত্তরপ্রদেশে ৫০ হাজার জালি স্কুল ছিল। যেগুলি আসলে কোচিং সেন্টার। সরকারি কাগজপত্র নকল করে তারা স্কুল খুলে বসেছিল।” সেই সময় এই প্রতাপ সিং এর টুকলি বিরোধী অভিযান সরকারকে সাহায্য করেছিল এই আইনের স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে।

কী ছিল এই আইনে?

এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘Unfair exam’ বন্ধ করে আসল রাঘববোয়াল গুলোকে জেলে ভরা। পরীক্ষার হলে অন্ততপক্ষে পাঁচজনকে যদি টুকলি করা অবস্থায় ধরা হয়, তবে তাদের পাঁচ বছর অব্দি জেল হতে পারে। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে এই আইনের ফাঁদে পড়লে জামিন পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল।

আইন প্রয়োগে টুকলি কী কমলো?

গণহারে টোকাটুকি কমানোর জন্য এই আইন কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল। যার ফলে মেলে আইন প্রণয়ন হওয়ার শিক্ষাবর্ষেই। আইনের কঠোরতার জন্য; ওই বছর যারা দশম এবং দ্বাদশ শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করেছিল, তাদের মধ্যে ১৭% পরীক্ষার্থী পরীক্ষা ফেলে মাঝপথে হল থেকে বেরিয়ে আসে। আইনের প্রভাব এতটাই বেশি ছিল যে, মাত্র ১৪.৭০% মধ্যবর্তী (intermediate) পরীক্ষার পরীক্ষার্থী এবং ৩০.৩০% হাই স্কুলের পরীক্ষার্থী ওই বছর উত্তরপ্রদেশ বোর্ড পরীক্ষায় পাস করে।এমনকি উত্তরপ্রদেশের প্রায় প্রত্যেকটি পরীক্ষার পর, পরের দিনের সংবাদপত্রে হাতকড়া পড়ানো পরীক্ষার্থীদের ছবি প্রকাশ হত।

এই বিষয়গুলি নিয়ে রাজনীতির পারদ চরমে ওঠে। তৎকালীন বিরোধী দল ছিল সমাজবাদী পার্টি (এসপি)। ১৯৯৩-এর ভোটের প্রচারে, মুলায়ম সিং যাদব অ্যান্টি কপিং অ্যাক্ট ১৯৯২-এর কঠোর সমালোচনা করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে এতটা ‘অমানবিক’ আইনের শাসনের পরিপন্থী ছিলেন না তিনি। তাই কল্যাণ সিং এর পর এসে মুলায়ম সিং যাদব মুখ্যমন্ত্রী হন। তখন এই আইন প্রত্যাহার করেন। ফলত আবারও টুকলির সিন্ডিকেট গুলির পুনর্জন্ম হয়।

এরপর ১৯৯৭-তে যখন আবার বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন কল্যান সিং মুখ্যমন্ত্রী পদে বসে আবারো অ্যান্টি কপিং অ্যাক্ট ১৯৯২-কে ফিরিয়ে আনে। তবে আইনের সংশোধন করে, কঠোরতা কমানো হয়।

তবে এই ধরনের আইন কেবলমাত্র ৯০ এর দশকেই থেমে থাকেনি। ঠিক এমন ধরনেরই আইন এই বছর জুলাইতে নিয়ে এসেছে রাজস্থান সরকার। এর শাস্তি কেবল ৫ বছরের জেল হেফাজত নয়। ১০ লাখ থেকে ১০ কোটি অব্দি জরিমানা হতে পারে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close