fff
খেলা

CWG 2022: অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী! জেদকে পুঁজি করে সোনার পদকজয় হাওড়ার অচিন্ত্যর

মহানগর বার্তা ওয়েবডেস্ক: অচিন্ত্য শিউলি নামটার সঙ্গে এতোদিন সেভাবে পরিচিতই ছিলোনা দেশের মানুষ। কিন্তু কমনওয়েলথ গেমস (CWG 2022) এ সোনা জেতার পর, গতকাল থেকে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে অচিন্ত্যর নাম। হাওড়া জেলার পাঁচলা ব্লকের দেউলপুরের বাসিন্দা অচিন্ত্য এই বছর কমনওয়েলথ গেমসে(CWG 2022) ৭৩ কেজি ভারোত্তোলনে(পুরুষ বিভাগে) সোনা জিতেছেন। আর এই সোনা (Gold Medal) জয়ের  পরেই অচিন্ত্যর বেড়ার বাড়ির সামনে ভীড় জমছে অগুনতি মানুষ আর সংবাদ মাধ্যমের। শুভেচ্ছা বার্তা এসেছে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর থেকেও। কিন্তু বার্মিংহামে এই সোনা জয়ের রাস্তা মসৃন ছিলনা অচিন্ত্যর জন্য। দারিদ্র্যের ভার বয়ে, ভারোত্তোলনে এগিয়ে গেছেন দেউলপুরের অচিন্ত্য। বহু প্রতিভা ছড়িয়ে আছে এই মাটির আনাচে কানাচে। পরিকাঠামোহীনতা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে যুঝতে পারেন না অনেকেই। ফলে হারিয়ে যায় বহু প্রতিভা। এবার স্রোতের বিপরীতে হেঁটে স্বপ্ন সফল করেছেন অচিন্ত্য শিউলি (Achinta Sheuli)। শিউলি অর্থাৎ যারা খেঁজুরের রস সংগ্রহ করেন। কিন্তু অচিন্ত্য খেঁজুরের রস সংগ্রহ করেননি, দেশকে গর্বিত করেছেন কমনওয়েলথ গেমসে (CWG 2022) সোনা (Gold Medal) সংগ্রহ করে।

কেমন ছিলো দারিদ্র্যের সঙ্গে অচিন্ত্যর সংগ্রাম?

অচিন্ত্য শিউলির(Achinta Sheuli) বাবা ছিলেন পেশায় ভ্যানচালক। নয় বছর আগে আকস্মিক প্রয়াত হন অচিন্ত্যর বাবা। তখন অচিন্ত্যর বয়স ষোলো বছর। এমনিতেই অভাবের সংসারে আরো জেঁকে বসে দারিদ্র্য। সংসারের জোয়াল টানতে অচিন্ত্যর মা জরির কাজ করেন। সংসারে সাহায্যের জন্য অচিন্ত্যও মায়ের সঙ্গে জরির কাজ করতে থাকেন। যে হাতে একসময় সোনালি জরি বুনে দিতেন অচিন্ত্য শিউলি(Achinta Sheuli); সেই হাতেই উঠে এসেছে স্বর্ণ পদক (Gold Medal)। অচিন্ত্যর দাদা অলোক শিউলিও ভারোত্তোলন করতেন। তাঁরও স্বপ্ন ছিলো বড়ো ভারোত্তোলক হওয়ার। দেশের মুখ ঊজ্জ্বল করার স্বপ্ন দেখতেন অলোকও। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পরে, সাংসারিক চাপে, জীবিকার সন্ধান করতে করতে আর বেশিদূর এগোতে পারেননি অলোক। থামতে হয় মাঝপথেই। কিন্তু ভাইকে থামতে দেননি অলোক শিউলি। ভাইয়ের স্বপ্নপূরণের জন্য নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়েছেন তিনি। ভাই যাতে কাঙ্কিত লক্ষে পৌঁছাতে পারে তার জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রম করেছেন অলোক।

দাদা অলোক শিউলির সঙ্গেই অচিন্ত্যর পরিচয় হয় স্থানীয় ভারোত্তোলক কোচ অষ্টম দাসের সঙ্গে। ২০১০ সালে ভারোত্তোলন করা শুরু করেন অচিন্ত্য শিউলি (Achinta Sheuli)।

এই জয়ের পর কী বলছেন সোনার ছেলে অচিন্ত্য?

অচিন্ত্যর কথায়, ‘‘আমার লড়াই ছিল নিজের সঙ্গে। সোনা জিততে আসিনি। নিজেকে টপকে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। সেটা পারিনি বলে খারাপ লাগছে। এই পদক আমি আমার দাদা এবং কোচকে উৎসর্গ করছি। বাবা মারা যাওয়ার পর দাদা আমার জন্য সব কিছু করেছে। নিজে ভারোত্তোলন করত। আমাকে তৈরি করার জন্য ছেড়ে দিয়েছে।’’

কী বলছেন অচিন্ত্যর ছোটো বেলার কোচ অষ্টম দাস?

অচিন্ত্যর এই সাফল্যে গর্বিত তাঁর কোচ অষ্টম দাস। গর্বিত প্রশিক্ষকের কথায়, “যখন আমার কাছে প্রথম আসে, তখন দেখে মনেই হয়নি ভারোত্তোলন করতে পারবে। খুব রোগা ছিলো। তবে অচিন্ত্য খুব তাড়াতাড়ি শিখতে পারতো।” চাষ অথবা মাটি কাটার জাজ করে কোনোমতে সংসার চালান অষ্টম বাবু। তাঁর আশা সরকারী সাহায্য পেলে একটা ভালো মতো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলতে পারেন তিনি। অচিন্ত্যর মতো এমন, বহু প্রতিভাবানকে সেখানে তৈরি করার প্রচেষ্টা চালাবেন অষ্টম বাবু। তিনি প্রশিক্ষণের জন্য কোনো টাকা নেন না। একটি প্রথম সারির দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অষ্টম বাবু বলেছেন, “আমার কাছে যারা শেখে, তারা অনেকেই প্রতিভাবান। কিন্তু কোনো পরিকাঠামো নেই। গাছের ছায়ায় অনুশীলন করাই। সরকারি সাহায্য পেলে আর একটু ভালো করে তৈরি করতে পারি ছেলেময়েগুলোকে।”

কী বলছেন অচিন্ত্যর মা এবং দাদা?

বহু দারিদ্র্যের মধ্যেও অচিন্ত্য শিউলির (Achinta Sheuli) এই স্বর্ণ পদক ( Gold Medal) জয়ে স্বাভাবিকভাবেই আনন্দিত তাঁর মা ও দাদা। টালির বাড়ির সামনে অগুনতি মানুষের অভিনন্দনে ভেসে যাচ্ছেন তারা। অশ্রুসজল চোখে ধরা গলায় অচিন্ত্যর মা পূর্ণিমা শিউলি জানাচ্ছেন “স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে খুব কষ্টে দিন কেটেছে। দুই ছেলেকে নিয়ে জরির কাজ করে কোনও রকমে দু’টো ভাত জুটতো।” ভাইয়ের এই সাফল্যের পিছনে যার ত্যাগকে কুর্নিশ জানাচ্ছে সবাই; সেই অলোক শিউলি কথায়, “দমকল বিভাগে অস্থায়ী কর্মী হিসাবে কাজ করি। একটা পাকা চাকরি হলে ভালো হয়”।

ভারোত্তোলনে যে পুষ্টির দরকার হয়, সেই যথেষ্ট পুষ্টিও জুটতোনা অচিন্ত্যর। শুধুমাত্র ডিম আর ঘুগনিই ছিলো তাঁর পুষ্টির উৎস। যদিও এইটুকু যোগার করতেও মাঠে কাজ করতে হতো তাঁকে। পরবর্তীকালে পুনেতে সেনাবাহিনীর স্পোর্টস অ্যাকাডেমিতে সুযোগ পাওয়ার পরে, পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়। যদিও সাংসারিক অনটনের পর্বটা একই রয়ে গেছে। সেখানে এখনো বেড়ার বাড়ি, টালির ছাদ আর দিন আনা দিন খাওয়ার নিত্য লড়াই।

কমনওয়েলথ গেমসে(CWG 2022) জেতা স্বর্ণ পদক (Gold Medal) তাঁর দাদা ও ছোটোবেলার কোচকেই উৎসর্গ করেছেন অচিন্ত্য। এখন তাঁর পরিবার অপেক্ষায়, দেশের মুখ উজ্জ্বল করা অচিন্ত্যর বাড়িতে কি অনটনের অন্ধকার দূর হবে! অচিন্ত্য এই সাফল্যেই খুশি হয়, তার আগাম লক্ষ্য ২০২৪ এর প্যারিস অলিম্পিক পদক।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please Disable your ADBlocker!