রাজনীতিসাক্ষাৎকার

সিপিএমের এক অংশ রেগে যাচ্ছেন,গালাগালি করাটা বিতর্ক নয়: দীপঙ্কর ভট্টাচার্য

বিহারে বিজেপি বিরোধী জোটে সিপিআইএমএল লিবারেশনকে দেখা গিয়েছিল সিপিএমের সাথে হাত মেলাতে। বাংলার বিধানসভাতে তা হলো না। বরং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিরোধিতায় দুই দলের অবস্থান ভিন্ন। তাঁরা একে অপরের সমালোচকও। লিবারেশনের প্রতি সিপিএমের অভিযোগ যে তাঁরা তৃণমূলের পক্ষপাতদুষ্ট। জোট, ভোট এসব কিছু নিয়ে মহানগর বার্তার প্রতিনিধি অর্পন চক্রবর্তীকে খোলামেলা সাক্ষাৎকার দিলেন সিপিআইএমএল লিবারেশনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য।

প্রশ্ন: আপনারা বলেছিলেন বিহারে বিজেপিকে রুখে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাতে আংশিকভাবে সফল হলেও পুরোপুরি হননি। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতিতে আপনাদের নতুনভাবে উত্থান হয়েছে। মানে কাজ পুরোপুরি সারা হয়নি কিন্তু সাফল্য এসেছে। এতে কি আপ্লুত হয়েছেন?

উঃ – আপ্লুত হওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের মূল লক্ষ্য তো একটা নতুন সমাজ যেখানে তার মানুষ তার সম্পূর্ণ মানবিক পরিচয় ও অধিকার অর্জন করতে পারবে। এই মুহূর্তে আশু চ্যালেঞ্জ হলো ফ্যাসিবাদের থাবা থেকে, বিজেপির সর্বনাশা নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশকে, দেশের গণতন্ত্রকে মুক্ত করা। বিহারে এই আশু লক্ষ্য পূরণের কাছাকাছি পৌঁছেও আমরা শেষ রক্ষা করতে পারিনি। বিহারের আপেক্ষিক নির্বাচনী সাফল্য সত্ত্বেও এই দুঃখের কথাই আমি বলেছি।

প্রশ্ন: পার্টির বিহারের গত বিধানসভা নির্বাচন লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা কি এখানে বাংলার ভোটে কাজে লাগছে?

উঃ – কিছুটা অবশ্যই লাগছে। সেটা হলো মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, অধিকার অর্জনের আন্দোলনের সঙ্গে নির্বাচনকে মেলানোর অভিজ্ঞতা। কিন্তু বিহারে একটা বৃহত্তর বিরোধী জোট তৈরী হতে পেরেছিল। সেই জোটের জায়গাটা পশ্চিমবঙ্গে নেই।

প্রশ্ন: পশ্চিমবঙ্গে আপনারা বলছেন অ-বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসুক, সেখানে তৃণমূল ক্ষমতায় এলে রাজ্যের পক্ষে ভালো হবে নাকি সংযুক্ত মোর্চা জোট?

উঃ – যদি সংযুক্ত মোর্চা ক্ষমতায় আসার মতো সম্ভাবনা গড়ে ওঠে আমরা অবশ্যই খুশী হব। কিন্তু সেটা হবে ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচন থেকে পরিস্থিতিতে একটা নাটকীয় পরিবর্তন। তার সম্ভাবনা কতটা সেই বিতর্কে না গিয়ে আমরা বিজেপি যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে তার উপর জোর দিয়েছি।

প্রশ্ন: আপনারা বলছেন সিপিএম মুখে বলছেনা কিন্তু কৌশলে বিজেপির সুবিধা করে দিচ্ছে, আর সিপিএম বলেছে আপনারাও মুখে বলছেন না কিন্তু কৌশলে তৃণমূলের সুবিধা করে দিচ্ছেন। নির্বাচনে এক বাম বনাম অন্য বাম যে এত বড়ো বিতর্ক তৈরি হচ্ছে, এটা অ-বাম বা আপনাদের বিরোধী দলগুলোর কাছে advantage হয়ে দাঁড়াচ্ছে না তো?

উঃ – আমরা শুধু এটুকুই বলেছি যে আমাদের মতপার্থক্য রয়েছে, আর তাই আমরা স্বাধীন অবস্থান নিয়েছি। আমি জানি না, সিপিএমের বন্ধুদের এক অংশ এতে এত কেন রেগে যাচ্ছেন। আমরা তো জোটে না থেকেও বামফ্রন্টের প্রার্থীদের অন্ততঃ চব্বিশটি আসনে সক্রিয় সমর্থন দিচ্ছি। আমাদের মূল লড়াই বিজেপির বিরুদ্ধে, সিপিএমের বিরুদ্ধে তো নয়। বিতর্ক যদি থাকে তাহলে তাকে পারস্পরিক সম্মান ও ধৈর্য সহকারে চালাতে হবে। গালাগালি করাটা বিতর্ক নয়, আর বিতর্কেই জড়িয়ে গিয়ে তাকেই মূল কাজ বা লক্ষ্য বানিয়ে ফেললে অবশ্যই মূল লড়াই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা এ ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক। সেটা আমাদের পার্টির নীতি ও অবস্থান এবং সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সর্বত্র আমাদের প্রচার ও রাজনৈতিক অভিযানের গতিপ্রকৃতি দেখলেই আপনারা বুঝতে পারবেন।

প্রশ্ন: ১২ টি সিটে লিবারেশনের প্রার্থীরা লড়াই করছেন, এর মধ্যে কোন বিধাসভায় সবচেয়ে ভালো ফল করতে পারে আপনাদের পার্টি?

উঃ – আমরা আমাদের সাম্প্রতিক কাজকর্ম, গণসংযোগ ও চলমান আন্দোলনের ভিত্তিতেই বারোটি আসন বেছে নিয়েছি। বেশ কিছু আসন এই কারণেই লড়ছি না কারণ সেখানে ২০১৬তে সিপিএমের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন। যেমন হুগলীতে পান্ডুয়া, বর্ধমানে পূর্বস্থলী, বা চব্বিশ পরগণার কামারহাটি বা কলকাতার যাদবপুর। অনেক আসন আমরা ছেড়ে দিয়েছি যাতে ভোট বিভাজনে বিজেপির সুবিধে না হয়ে যায়।

প্রশ্ন: বিজেপি বা অন্য দলের তরফে কেউ কোনো বেলাগাম মন্তব্য করলে আপনাদের তাঁর বিরোধীতা করতে দেখা যায়। এই সদ্য দিলীপ বাবুর ‘রগড়ে’ দেব মন্তব্যর কথাই ধরুন। কিন্তু এমন বেলাগাম মন্তব্য শাসক দল তৃণমূলের তরফ থেকে এলে অভিযোগ যে আপনারা চুপ থাকেন। যেমন মহুয়া মৈত্রের ‘দু-পয়সায়’ সাংবাদিক মন্তব্য।

উঃ – ব্যাপারটা এটা নয় যে বিজেপির বিরুদ্ধে বলব আর অন্য দলের বিরুদ্ধে বলব না। মহুয়া মৈত্রের মন্তব্য অবশ্যই নিন্দনীয় ও অশোভন। সাংবাদিকদের স্বাধীনতার উপর যে কোন আক্রমণের আমরা বিরোধিতা করি, সাংবাদিকদের পক্ষে দাঁড়াই। সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রশ্নে আমরা অভিব্যক্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করি। কিন্তু দিলীপ ঘোষের মন্তব্য সরাসরি চোখ রাঙানি বাংলার প্রগতিশীল শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে। আর সেই কারণেই শুধু আমরা নই, বাংলার ব্যাপক গণতান্ত্রিক জনমত দিলীপ ঘোষের মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। ভারসাম্য রক্ষার জন্য এক দলের বিরুদ্ধে বললেই অন্য দলের বিরুদ্ধেও বলতে হবে এমন হিসেবে আমরা চলি না। প্রশ্নের গুরুত্ব অনুযায়ী আমরা সাড়া দেবার চেষ্টা করি।

প্রশ্ন: আপনারা মাঝে মাঝেই অভিযোগ করেন যে মূলধারার সংবাদমাধ্যম আপনাদের প্রতি উদাসীন, কিন্তু দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এখন যা বলছে সেটাই তো খবর হয়ে যাচ্ছে দেখছি।

উঃ – আমার কথাকে বিকৃত করে বা ভুল ব্যাখ্যা করে খবর বানানো হলে সে তো এক নতুন সমস্যা। প্রশ্নটা হলো সঠিক ভাবে জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারা। তাছাড়া তথাকথিত মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমে আমরা এখনও প্রায় অনুপস্থিত। প্রাতিষ্ঠানিক মিডিয়ার বাইরে বিকল্প মিডিয়াতেই আমাদের কিছুটা উপস্থিতি রয়েছে।

প্রশ্ন: বালি বিধানসভার সংযুক্ত মোর্চা প্রার্থী দীপ্সিতা ধর বলেছেন যে ‘ দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নিয়ে আরো অনেক কিছু জানতে হবে’ এই মন্তব্য-এর কি উত্তর দেবেন?

উঃ – খুব ঠিক কথা বলেছেন। বিশেষ করে এমন একটা সময়ে যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহে বড় বড় পরিবর্তন ঘটে চলেছে। আমি রাজনীতিকে সমাজ পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক অনুসন্ধান ও অধ্যয়নেরও মাধ্যম বলে মনে করি। সমাজ ও পরিস্থিতিকে জানা বোঝা ও তাকে পাল্টানোর কাজটা সাথে সাথেই চলতে পারে বা চলা উচিত। বিশেষ করে মুক্তিকামী রাজনীতির জন্য এটা অত্যন্ত জরুরী।

প্রশ্ন:সিপিএমের অভিযোগ যে শীতলকুচিতে যা হলো তার পিছনে অন্যতম কারণ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্ররোচনামূলক মন্তব্য। কিন্তু আপনারা আপনাদের বক্তব্যে সে কথা বলেন নি। সিপিএমের এমন অভিযোগ কি তবে ভুল? আপনারা স্বীকার করেন না? এখানে দোষটা কি কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের?

উ: ঘটনার উৎস যাই হোক তাকে সামলাতে গুলি চালিয়ে ভোটারদের মেরে ফেলাটা স্পষ্টতঃই ভোটারদের মনে ভয় সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য থেকে। আমরা এই গুলিচালনা ও হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত এবং দোষীদের উচিত শাস্তির দাবি জানাই।

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close