সাক্ষাৎকার

বাংলায় বিজেপি সাম্প্রদায়িক নয়: মহানগর বার্তায় বিস্ফোরক গর্গ চট্টোপাধ্যায়

গর্গ চট্টোপাধ্যায়। একাধারে অধ্যাপক-গবেষক। আবার অন্যদিকে বাঙালির অধিকার রক্ষার আন্দোলনের মুখ্য পথনির্দেশক। শুধু বাংলা ভাষার বঞ্চনা নিয়েই নয়, গর্গ বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছেন একাধিক ইস্যুতে। অসমে এনআরসি থেকে শুরু করে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার, তাঁর বাক্যবাণে বিদ্ধ হয়েছে বারবার। সেই গর্গ চট্টোপাধ্যায়ই এবার মুখ খুললেন মহানগর বার্তা-য়। একাধিক ইস্যুতে বিস্ফোরক তিনি। বিজেপি থেকে তৃণমূল, সিপিআইএম। হিন্দি থেকে তামিল। এসএসসি থেকে শিক্ষানীতি, একাধিক ইস্যুতে অকপট গর্গ।

রাজ্যে দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, অপরাধ নিয়ে একাধিক আন্দোলন হচ্ছে, রাজ্যের বাঙালির স্বার্থ সেখানে জড়িত। বাংলা পক্ষের উপস্থিতি কোথায়? বিরোধীরা এ নিয়ে কটাক্ষ করছেন! কী বলবেন?

দেখুন, ২০১৯ থেকে এসএসসি চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে বাংলা পক্ষ রয়েছে। আমরা যাচ্ছি বারবার। এই বিজয়ার দিন নিজেও গিয়েছিলাম ওঁদের কাছে। আমরা পিএসসি ভবন ঘেরাও করেছিলাম। তখন দাবি ছিল, স্বচ্ছ নিয়োগের।আসলে আমাদের সংগঠন যেখানেই বাঙালি নিপীড়িত, সেই সব জায়গায় রয়েছে। এত কথা হচ্ছে, কিন্তু রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কোথায়? এর বিরোধিতা হচ্ছে না তাদের তরফে মানুষ এবার বুঝছেন! তৃণমূলকে বলেছি, সিপিএমকেও বলেছি পাশে দাঁড়াতে, কেউ আসে না। আমাদের যা শক্তি সেই অনুযায়ী লড়াই করতে হয়। বিরোধীদের সব কাজ আমাদের যদি করতে হয়, তাহলে বাকি কাজের কী হবে। শাসক-বিরোধী পক্ষ নয়, সবার উপরে বাংলা পক্ষ।

হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ। এই ইস্যুতে লড়ছে বামপন্থীরাও। নয়া শিক্ষানীতির বিরূদ্ধে বাম ছাত্র সংগঠন কলেজ স্ট্রিটের সভায় খসরা বিল পেশ করেছে। এই লড়াইকে আপনারা সমর্থন করেন? নাকি বিরোধিতা?

আমাদের কোনো দলের বিরুদ্ধে সমালোচনা নেই। আমরা বিশ্বাস করি শিক্ষা রাজ্যের তালিকায় থাকবে, এতে কেন্দ্রের কোনও হস্তক্ষেপ থাকতে পারে না। শিক্ষানীতি, নয়া শিক্ষানীতি, এসব থাকার প্রয়োজন নেই! আমরা বাংলাপক্ষ, বাঙালি জাতীয়তবাদী আদর্শ এবং তার নিরিখে রাষ্ট্রীয় শিক্ষানীতির এক একটি দিক ধরে ধরে মতামত রেখেছি। আসলে এর মূল বিষয় হল, সবকিছুর কেন্দ্রীকরণ। সব ঠিক করবে দিল্লি? ঠিক করবে সেই আমলারা, যাঁরা উত্তরপ্রদেশ, বিহারের মতো য শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা রাজ্যের! আমরা উর্দু, হিন্দি, কেন্দ্রীয় বোর্ড চাই না। আমরা চাই বাংলায়, বাংলা ভাষায় শিক্ষা। সর্বভারতীয় পরীক্ষা না থাকুক এটাও চাই। রাজ্যের কোটা থাকুক, সেই কোটা পূরণের জন্য রাজ্য সরকার পরীক্ষা নিক। আজ যদি এইমসে ভর্তি হতে হয়, বলে দিক রাজ্যের জনসংখ্যা অনুযায়ী ৮ শতাংশ কোটা রাজ্যের। রাজ্যর পরীক্ষা অনুযায়ী ভর্তি হোক ওই কোটায়। বাঙালিরা ডাক্তার হন। এই শিক্ষানীতি গ্রাম বিরোধী, গরিব-মধ্যবিত্ত বিরোধী, বিচ্ছিন্ন-নিপীড়িত, দুর্বল, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিরোধী, অহিন্দি বিরোধী। আমরা রাজ্যের হতে ক্ষমতা চাই। বাংলা কী পড়বে বাংলা, বাঙালি ঠিক করবে।

এখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। বিশেষত, মুসলমানরাও বিজেপি করেন। অবাঙালি মানুষ, যাঁরা বাঙালির জাতিসত্তাকে ভালোবাসেন। তাঁদের নিয়ে কী বলবেন আপনারা?

বহু মুসলমান বিজেপি করেন! এর মধ্যেই ধরে নেওয়া হচ্ছে বিজেপি একটি হিন্দুদের সংগঠন। তবুও বহু মুসলমান মানুষ এই দলে রয়েছেন। এটা বিরাট ভ্রান্তি। বাংলাপক্ষ হিন্দি সাম্রাজ্যবাদকে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ হিসেবেই চিহ্নিত করে। যার ধারক এক সময় কংগ্রেস ছিল। এখন বিজেপি। আসলে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ হল; গুজরাতি, মারাঠি পুঁজির বাজার দখল। আর সেই দখল করা বাজার, আয়ত্তে রাখতে অহিন্দি রাজ্যে তা প্রবেশ করিয়ে দিয়ে, ভূমি পূত্রদের দাস, সংখ্যালঘু বানিয়ে দেওয়া! এটা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। বিজেপি এমন একটি দল। বাংলাপক্ষ, বাংলার মাটিতে বিজেপিকে সাম্রাজ্যবাদী দল মনে করে, সাম্প্রদায়িক দল নয়। কারণ, বাংলার মাটিতে কোনও এক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হতে হবে, তবেই না সম্প্রদায়িক হবে! তবে বাংলায় যে, মূল দুটি সম্প্রদায় হিন্দু বাঙালি, মুসলমান বাঙালি। এদের জন্য বিজেপি খারাপই করেছে। যেমন অসমে, ১৭ লাখ বাঙালির নাগরিকত্ব শেষ হয়েছে এনআরসি-র মাধ্যমে। এর মধ্যে ১২ লাখ হিন্দু বাঙালি। ৫ লাখ মুসলমান বাঙালি। ২০০ এর উপর বাঙালি আত্মহত্যা করেছেন। যার অধিকাংশ হিন্দু বাঙালি।

এই কারণেই বিজেপিকে সাম্রাজ্যবাদী দল বলছেন?

অনেকটা তাই। দেখুন, এই বাংলার মাটিতেই বাংলা, বাঙালি বিরোধী কার্যকলাপ চালিয়েছে। বিজেপির স্টক ভোটার বিহারি, অবাঙালি; এঁরা বাঙালিদের বাংলাদেশি মনে করে। আমরা দেখেছি, বিহারের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী সুশীল মোদী বলছেন, বাংলায় বিজেপি জিতলে লাখ লাখ বিহারির চাকরি হবে। বিজেপি-কে হিন্দু-মুসলিম এই অর্থে নয়, এটা সাম্রাজ্যবাদী দল। অন্য রাজ্যে যখন এরা ঢুকছে হিন্দুত্ব একটা আঁকশি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেটা নিয়ে ঢোকে। বিজেপি ইউপি, বিহারে সম্প্রদায়িক।

বাঙালি নিয়ে আন্দোলন। বাংলার কথা বলছেন। কিন্তু অন্য রাজ্যেও তো বাঙালিরা রয়েছেন। সেই ক্ষেত্রে?

অন্যান্য রাজ্যে বাঙালিরা রয়েছেন। প্রথম ভাষা সেখানে বাংলা নয়, অন্য ভাষা শেখেন তাঁদের সন্তানরা। অনেকের সম্পর্ক তৈরি হয়, বিবাহ হয় অন্য রাজ্যের লোকের সঙ্গেই।আমরা চাই এরাজ্যের অবাঙালিরাও মিলিত হন বাঙালির সঙ্গে। মিলে যান তাঁরাও। আমরা কোনও জাতির বিরূদ্ধে নয়, আমরা চাই আমাদের মতোই মিলে যাক সবাই।

বাংলা পক্ষ দাবি করে, তাঁদের সদস্যদের মধ্যে অনেকেই অবাঙালি। তাহলে কি সত্যিই মিলে যাচ্ছেন তাঁরাও?

না সেটা বলছি না। তবে দমদম, শিলিগুড়িতেও আমাদের একাধিক অবাঙালি সদস্য রয়েছেন। আমরা এক হয়ে থাকতে চাই। ববাংলাকে যাঁরা নিজেদের ভূমি হিসেবে মেনেছেন। কিন্তু যারা মানসিকতায় এখনও ইউপি, বিহারি এখানে থেকেও আমাদের বিরোধ এদের বিরুদ্ধে। যদিও যাঁরা বহুদিন ধরে এরাজ্যে রয়েছেন তাঁরাও আমাদের আন্দোলনের সুবিধা পাবেন।

তাহলে বাংলায় বাঙালি ছাড়া আর কারওর জায়গা নেই?

আর নতুন করে আসতে দেব না আমরা। তবে পূর্ববঙ্গের বাঙালি নিপীড়িত হয়ে এখানে এলে তাঁর আসার অধিকার আছে। চিরকাল অধিকার আছে থাকার।

সরকারি ক্ষেত্রে হিন্দি ভাষার প্রভাব। চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে কী বলবেন? কেন এমন করতে চাইছে বিজেপি?

হিন্দি, বাংলা, তামিল, তেলেগু, মারাঠি, সবই আঞ্চলিক ভাষা। হিন্দি ভাষাও তাই। রবীন্দ্রনাথ তো স্পষ্ট করেছিলেন, যাঁরা কিছু জানেন না ওঁরাই নাকি হিন্দিভাষী। বলুন তো, বাঙালি বিপ্লবীরা প্রাণ দিয়েছেন কীসের জন্য? তাঁরা তো সব জাতির সমান অধিকারের জন্য লড়াই করেছিলেন। কিন্তু আমরা কী দেখছি! কংগ্রেসের মাধ্যমে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের কুক্ষিগত রূপ দেখেছি। পরে বিজেপি একই কাজ করছে।

কেন এই অভিযোগ করছেন?

আসলে বিজেপি জানে, দেশের অর্থনীতির অবস্থা খারাপ। উত্তরপ্রদেশ, বিহারের একই অবস্থা। জনঘনত্ব, বেকারত্ব ভয়ংকর। অহিন্দি রাজ্যের চাকরি, অর্থ; বিজেপি ওই সব রাজ্যের লোকের কাছে যদি তুলে দিতে না পারে তাহলে অসুবিধা হবে। গুজরাটি, মারাঠি পুঁজির প্রভাব স্থায়ী করতে, হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিস্তারের জন্য এসব করছে। ওই সব রাজ্যের উন্নতি হয়নি এর জন্য বাঙালির দায় হতে পারে না। বাংলা কোনও ধর্মশালা নয়। মানুষ ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করব, যাতে বাঙালি, তামিল দ্বিতীয় শ্রেণীর হয়ে যায়! আশ্রিত হয়ে যায়! ২০২৬ -এর আগে এমন একটা চক্রান্ত।

এর জন্য কী করছে বাংলাপক্ষ?

১৯৬৫ সালে এই লড়াই একা তামিলরা লড়েছিল। এবার সবাই এক হয়েছে। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ ভালো হচ্ছে। তারা কী চায়, কেন্দ্রীয় সমস্ত কিছুর ক্ষেত্রে হিন্দির প্রাধান্য বাড়ানোর ইচ্ছা, উপনিবেশ যেভাবে কাজ করে, হিন্দিরাজ কায়েম করতে চায় যেভাবে, সেটা হতে দেব না আমরা। বিজেপি আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর দাস বানাতে চায়। সেটা আমরা হতে দেব না।

১২ তারিখের জমায়েত নিয়ে কী বলবেন? কত লোক হবে আশা করছেন?

আমাদের নিজস্ব সমর্থক শুধু নয়। হাজার হাজার মানুষ আসবেন। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি-সহ একাধিক জেলার লোক আসবেন। আমরা বিভিন্ন ব্লকে জমায়েতের ডাক দিয়েছি। সব জায়গায় ছোট বড় জমায়েত হবে, রবিবার ১৬ তারিখ এই জমায়েত। আগেরবার তো পুলিশ বলেছিল ৩০০০ মানুষ এসেছিলেন। এবার বহু সাধারণ মানুষ যোগ দেবেন।

সাধারণ মানুষ? কেন?

কারণ, বিজেপি আমি বাদই দিলাম তৃণমূল-সিপিআইএম যারা বাঙালির ভোট নেন, তারা তো এই ইস্যু তুলছেন না। তামিলনাড়ুতে এরকম সংগঠনের সঙ্গে শাসক, বিরোধী একসঙ্গে থাকলেও, এখানে মানে এই রাজ্যে কোথায়?

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close