ফিচার

ভালো মানিক আর ‘কালো মানিক’, দুই বঙ্গের দুই ছবিতে কথায় বাড়ল কথা

রমেন দাস: মানিক তুমি বড্ড ভালো, ভীষণ কাছের লোক, তোমার কথাই ভাবতে থাকি ঘুমের ঘোরে রোজ!

বাংলা এখন মানিকময়, বাংলার ছত্রে ছত্রে বিরচিত মানিক-কথা! উত্তরবঙ্গে এক মানিক আর দক্ষিণবঙ্গে আর এক মানিক। মাঝখানে শুধু একটুখানি তফাৎ! এক জন মানুষ বাঁচিয়ে নায়ক, আর এক জন মানুষ মেরে (পড়ুন চাকরি লোপাট) নায়ক! নাহ্, এই মানিক অভিযুক্ত। আদালতে বিচারাধীন মামলা। তিনি মানুষ মেরেছেন কি মারেননি, তিনি চাকরি খেয়েছেন কি খাননি, এ নিয়ে অভিযোগের আবহে একাধিক জল্পনা থাকলেও বঙ্গ-গসিপের অলিন্দে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, মানিকের এক রকমফেরের কথকতা! যেখানে মহম্মদ আর ভট্টাচার্যকে হিন্দু-মুসলমানে গুলিয়ে নিয়ে নয়, যেখানে মোমিনপুর, একবালপুর নির্যাতনের অভিযোগকে এক করে নয়, দুই মানিকে বর্ষিত হচ্ছে সামান্য তুলনার কথা।

দশমীর দিন। দুর্গামায়ের বিসর্জনের দিন। নদীতে এল হঠাৎ বান। ডুবন্ত মানুষ, আর নিমজ্জিত মানবতাকে টেনে তুলতে বিপদের জলে ঝাঁপ দিয়েছিলেন মহম্মদ মানিক। প্রায় একই কাজ করেছিলেন বিনুরা। প্রকাশ্যে এসেছিল হিরো মানিকের নাম। তাঁর মানুষ হিসেবে মানুষ বাঁচানোর কর্তব্য হয়ে উঠেছিল মহান। প্রত্যেকমুহূর্তে মানুষের জন্য ঠিক যেটুকু করা প্রয়োজন, তাই-ই বারবার উঠে আসার কথা থাকলেও ধর্মধর্ম ভাব আর ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে এসেছিলেন মহম্মদ মানিক।

নামের ক্ষেত্রে মহম্মদ না মানিক আগে থাকবে, তা নিয়ে প্রবল বিতর্ক থাকলেও মানুষের জন্য, প্রাণ বাঁচানোর কারিগর হিসেবে উঠে এসেছিলেন জলপাইগুড়ির মালের যুবক মানিক মহম্মদ। জীবন বাঁচিয়ে সাড়া ফেলেন তিনি।

কিন্তু কী আশ্চর্য সমাপতন দেখুন! মাত্র এক সপ্তাহ আগে ঘটা হিরো মানিকের কাণ্ডের সূর্যাস্তের আগেই ফের উঠে এল আর এক মানিকের সূর্য। যেখানে আলোর চেয়ে অন্ধকারই বেশি। কারণ, এই মানিক অর্থাৎ তৃণমূল বিধায়ক-নেতা, প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতি মানিক ভট্টাচার্য ঠিক যে কারণে বিখ্যাত হলেন তা যে বাঙালির জন্য, বাংলার জন্য, রাজ্য সরকারের জন্য, শিক্ষার জন্য, শিক্ষকদের জন্য যথেষ্ট সুখের এবং লজ্জার নয়, একথা বলছেন না কেউই। অর্থাৎ এই মানিকের বিখ্যাত হয়ে ওঠার আবহ অন্ধকারের অতলেই উদ্ভাসিত। যতই তিনি অভিযুক্ত হোন, যতই তিনি রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য সুবীরেশ ভট্টাচার্য, প্রাক্তন এসএসসি উপদেষ্টা শান্তিপ্রাসাদের মতো অভিযুক্ত হন না কেন, তিনিও যে চাকরি চুরির, চাকরি খাওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারেন, একথা বঙ্গের ঘরে ঘরে প্রায় বিশ্বাস করে নিয়েছেন মানুষ! অর্থাৎ সবজি থেকে রিকশাওয়ালা, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে ওয়াকিবহাল সব পক্ষই বলে দিচ্ছেন, মানিক ব্যাটাও… !

না না। আপনি যেটা ভাবছেন আমরা সেটা বলছি না, মানে বলতে পারি না! তবুও শুধুই তুলনা করছি মাত্র। এই যে মাল এলাকার হিরো মানিক। নামে এক হলেও দু’জনের কাজের ইতিহাস একবার ভাবুন। ছাপোষা নিম্নবিত্ত, গ্রিল কারখানার কম বেতনের কর্মচারি, এক সন্তানের বাবা মানিক মহম্মদ কী করেছিলেন, কীভাবে মানুষ বাঁচিয়েছিলেন! আর এই মানিক ভট্টাচার্য। যিনি প্রভাবশালী, বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন বারবার। বর্তমানে বিধায়ক, বাতিওয়ালা গাড়ি চড়েন। অট্টালিকায় বাস। এক কথায় হাজার পুলিশ। সারাক্ষণ নিরাপত্তারক্ষী। তবুও তিনি কী করলেন? তাঁর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ উঠল? কী কারণে গারদের দরজা খুলল তাঁর জন্য?

মঙ্গলবার বয়ানে অসঙ্গতি এবং জেরায় অসহযোগিতার অভিযোগে মানিককে গ্রেফতার করেছে ইডি। সোমবার সিজিও কমপ্লেক্সে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তৃণমূল বিধায়ককে। অভিযোগ ওঠে, তদন্তে অসহযোগিতা করছেন মানিক।

প্রসঙ্গত, পার্থ চট্টোপাধ্যায় গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে জল্পনা শুরু হয় প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীকে এবং গ্রেফতার হওয়া বাকিদের জিজ্ঞাসাবাদে টেট দুর্নীতি, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগে নাম উঠে এসেছে মানিক ভট্টাচার্যের। অর্থাৎ প্রাথমিকে চাকরি দেওয়ার নামে যে বিপুল দুর্নীতি হয়েছে, সেই ক্ষেত্রে বারবার নাম এসেছে মানিকের। এদিকে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে তদন্তে অসহযোগিতা করছেন মানিক। ঠিক এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দাবি করা হয়, মানিক ভট্টাচার্য পলাতক! আবার তখনই নিজের কলকাতার বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে মানিক দাবি করেন, তিনি বাড়িতেই ছিলেন। প্রশ্ন ওঠে ইডি-সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়েও।

উল্লেখ্য, আগেই নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে নেমে পার্থ-সহ একাধিক গ্রেফতার হয়েছেন। সেই ঘটনায় আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে ইডি। সেখানে দাবি করা হয়েছে, পার্থ এবং প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতির যোগসাজশের কথা। সূত্রের খবর পরে হোয়াটসঅ্যাপে কথোপকথনের বিষয়টি জানা যায়। সেখানে মানিক ভট্টাচার্য পার্থর সঙ্গে ১০ মিনিট কথা বলতে চান। সেই কথা হয়েছিল কি না জানা না গেলেও দেখা যায়, ওখানেই উল্লেখ করা হয়েছে এক জনৈক ব্যক্তির মেসেজের কথা। যিনি পার্থকে জানান, মানিক ভট্টাচার্য টাকা তুলছেন নানা ভাবে। নদীয়া জেলায় প্রাথমিক নিয়োগ থেকে শুরু করে বিএড কলেজে টাকা তোলা, সব বিষয়ে অভিযোগ যায় পার্থর কাছে। জানা যায়, ওই অভিযোগের মেসেজ নাকি মানিককেই ফের পাঠান পার্থ! এখানেই সন্দেহ আরও বাড়ে! তাহলে কি পার্থ এবং মানিক-সহ বাকিদের চক্রান্তে এই নিয়োগ দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে! এই জল্পনা থেকেই বারবার ডেকে পাঠানো হয় মানিককে। একবার সিবিআই, একবার ইডি ডাকে তাঁকে। অবশেষে আর রেহাই পেলেন না তিনিও। গ্রেফতার হতে হল তাঁকে।

যদিও চাকরিপ্রার্থীরা আন্দোলন মঞ্চ থেকে একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন, প্রাথমিকে দুর্নীতির অভিযোগে প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে মানিকের। এমনকি রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী থেকে সিপিআইএম নেতারা, মানিক ভট্টাচার্য যে এই কাণ্ডে জড়িত, একথা বলছিলেন তাঁরাও।

প্রসঙ্গত, প্রাথমিকে নিয়োগ দুর্নীতি মামলা আদালতে গড়ালে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে তদন্তের ভার দেয় আদালত। সেই নির্দেশ অনুযায়ী একের পর এক মামলার তদন্ত করছে ইডি, সিবিআই। সেখানে দাঁড়িয়ে পার্থর বান্ধবী অর্পিতা মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়, গ্রেফতার একাধিক। রাজ্যের দুর্নীতি-ইতিহাসে ভাঙছে একের পর ইতিহাস। হাতে গরম ইস্যুতে সুর চড়াচ্ছেন বিরোধীরা। এবার সেই অবস্থানেই ফের তৈরি হল নতুন বিতর্ক। অবশেষে গারদেই যাচ্ছেন মানিক! অভিযোগ প্রমাণ হবে কি হবে না, তা আমরা কেউ না জানলেও অভিযুক্ত মানিকের আবহ, চাকরি চুরির মারাত্মক অভিযোগ, বঞ্চনার বিপরীতে আর এক মানিকের মানবকল্যাণে নায়ক বনে যাওয়া ফের যেন বেশি করে স্পষ্ট করছে রাজ্যের বর্তমান এই কালো মানিককেই!

(এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত সমস্ত মন্তব্যের দায় প্রতিবেদকের)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close