ঢ্যাং-কুরাকুর

জমিদার বাড়ির পুজো থেকে বারোয়ারি পুজো চালু, দৃষ্টান্ত গড়েছিল হুগলির গুপ্তিপাড়া

করোনা অতিমারীতে নাজেহাল গোটা বিশ্ব। তবু দুর্গাপুজো নিয়ে উন্মাদনায় ভাঁটা পড়ে নি এপার বাংলার বাঙালিদের। ইতিমধ্যেই আশ্বিনের আকাশে যথারীতি বেজে উঠেছে ‘আলোর বেণু’। পাড়ায় পাড়ায় উঁকি মারতে থাকা বাঁশের কাঠামো জানান দিচ্ছে খুব চেনা সেই রোমাঞ্চের-‘পুজো আসছে’।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের পাড়ায় পাড়ায় এই বারোয়ারি দুর্গোৎসবের সূচনার ইতিহাসটা কী?দেবী হিসেবে মা দুর্গার আরাধনা কিন্তু মোটেই সার্বজনীন ছিল না আঠারো-উনিশ শতকের বাংলায়। সেসময় আশ্বিনের শারদপ্রাতে কলকাতা ও তৎকেন্দ্রিক গ্রাম বাংলার ছবিটা ছিল কিছু ভিন্ন। মূলত বিত্তশালী জমিদার বাড়ির পাঁচ দিন ব্যাপী আমোদের উপলক্ষ্য হিসেবেই প্রচলিত ছিল দুর্গোৎসব।

শোনা যায়, আঠারো শতকে গোরা সাহেবদের কাছে সিরাজের পরাজয়ের পর যে একশ্রেণীর জমিদার দল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদলেহনকারী চাটুকারে পরিণত হয়েছিল, তাঁদের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল দুর্গাপুজোর রমরমা। কোম্পানির সাহেবদের আমোদ আহ্লাদের পুরোদস্তুর বন্দোবস্ত থাকত সেসময়ের পুজোয়। কিন্তু থাকত না সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার। জানবাজারের রানী রাসমণির পুজো অবশ্য ব্যতিক্রমী ছিল। সেখানে পুজোর দ্বার খোলা থাকত সাধারণ প্রজাদের জন্যই।

এরপর ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়া এলাকার (অনেকের মতে, জায়গাটির আসল নাম গুপ্তবৃন্দবন পাড়া) এক পুজো অর্থাভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। শোনা যায়, তখন পাড়ার বারোজন বন্ধু মিলে সেই পুজো আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। আর সেই বারো জন ‘ইয়ার’ অর্থাৎ ‘বন্ধু’ মিলে যে দুর্গাপুজোর সূচনা করেন, তাকেই বারোইয়ারী পুজো বা বারোয়ারি পুজো বলা হয়ে থাকে। এভাবে গুপ্তিপাড়ার হাত ধরে দুর্গোৎসব জমিদারদের প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এল, দেবী হয়ে উঠলেন সার্বজনীন।

গুপ্তিপাড়ার পুজোকে অনুসরণ করে মফস্বল এলাকাগুলোয়, এমনকি গ্রামগঞ্জেও এই বারোয়ারি পুজো জনপ্রিয় হতে থাকে। তবে শহরাঞ্চলে এই পুজোর চল আসতে সময় লেগেছিল একশো বছরেরও বেশি। সেসময়কার শহুরে দুর্গোৎসবের উন্মাদনাকে খানিক ছোঁয়া যায় কালিপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোমপ্যাঁচার নকশা’য়। উনিশ শতকের সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক টালমাটাল সময় পেরিয়ে বাংলার দুর্গাপুজো একসময় পা দেয় বিপ্লবের বিশ শতকে। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে মা দুর্গার দুর্গতিনাশিনী রূপই তখন যেন মিশে গিয়েছিল ভারতমাতার রূপের সঙ্গে।শত শত তরুণ প্রাণকে সাহস জুগিয়েছিল আত্মবলিদানের।

১৮৩২ সালে কলকাতায় সর্বপ্রথম বৃহৎ পরিসরে বারোয়ারি দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়। এই পুজোর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন কাশিমবাজারের রাজা হরিনাথ। ১৯১০ সালে এই বারোয়ারি পুজো ‘সার্বজনীন দুর্গাপুজো’র রূপ নেয়। এক্ষেত্রে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলে আদিগঙ্গার তীরবর্তী বলরাম বসু ঘাট রোডের বাসিন্দারা প্রথম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এরপর এক চালার সাবেকি প্রতিমার থিমের রূপ নিতে আর বেশি দেরী হয় নি। সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলে সার্বজনীন হয়ে উঠেছে এপার বাংলার বাঙালিদের প্রিয় দুর্গোৎসব।

তথ্যসূত্র: ‘হুতোমপ্যাঁচার নকশা’ , কালিপ্রসন্ন সিংহ

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close