খবররাজ্য

মমতার প্রশংসা, অভিষেকের ‘নিন্দা’! পরোক্ষে কী হুঁশিয়ারি দিলেন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়

নিজস্ব প্রতিবেদন: “বিচারবিভাগ আর আমার সম্পর্কে নাম নিয়ে কিছু বলা হলে কঠিন ব্যবস্থা নেব। বিচারবিভাগ যদি ব্যবস্থা নেয়, সেটা সামলাতে পারবেন ওঁরা! বিচারব্যবস্থার প্রতি এই অন্যায় করবেন না! লোকে দলবিভাজন করবেন বিচারপতি নিয়ে। আমাকে জড়িয়ে বলা হচ্ছে না, কিন্তু বলছে। আমাকে মারতে পারে যায় আসে না। বিচারবিভাগের প্রতি যে বা যাঁরা এসব করবেন তাঁদের বিরুদ্ধে কড়াব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ। আমি কয়েকটি ক্লিপ দেখেছি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হাইকোর্ট নিয়ে বলেছেন। আমার নামে কিছু না বললেও বিচার, জামিন পাওয়া নিয়ে মন্তব্য করছেন!” একটি বেসরকারী চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি আরও বলেন,”অভিষেক বন্দোপাধ্যায় বলেছেন কিছু বিচারকের মাথায় বিজেপির হাত আছে, আমি যদি ডেকে জিজ্ঞেস করি বলুন, কার কার মাথায় বিজেপির হাত আছে। উনি কিছু করতে পারবেন না। তখন মিথ্যে কথার জন্য তিনমাস জেল হবে।” বিচারপতির দাবি, “এই ইন্টারভিউ নিয়ে যদি বলা হয়। কিছু ব্যবস্থা হয়, কিছু মনে করি না। দুর্নীতিকে নিয়ে মুখ খোলা নিয়ে কোনও ভয় নেই!”

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম করে বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য ফের বাড়িয়েছে বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে তাহলে কি পরোক্ষে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো রাজনৈতিক নেতাদের বিচারবিভাগ সংক্রান্ত মন্তব্য নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখলেন তিনি?

প্রসঙ্গত, দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বিচারপতি বলেন, ”এসএসসি খুব ভাল ছিল। রণজিৎ বসুর সময়ে ঘোষণা করা ছিল কোনও দুর্নীতি যেন না হয়। তিনি এসএসসি প্রার্থীদের নিজের ছাত্র হিসেবে মনে করতেন, আমাদের বলা হত অসঙ্গতি থাকলে আদালতে আইনজীবী হিসেবে মেনে নিতে।” বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় মন্তব্য করেন, “বহুদিন বেকার ছিলাম, বেকারদের চোখের জল আমি দেখতে পাই। চোখের জলে বালিশ ভেজা আমি দেখতে পাই। বিচারপতি হিসেবে বসে দেখতে পাই একটা অনুমোদিত দুর্নীতি রয়েছে। একই জিনিসের স্ববিরোধী হলফনামা দেখে মনে হয় এর মধ্যে কিছু আছেই! যদিও পুলিশের উপর ভরসা আছে। কিন্তু পুলিশ তো নিয়ন্ত্রিত হয়। সিবিআই নিয়ন্ত্রিত হয় না বলব না। তবুও তো কিছু করতে হবে। কিছু বেরোবে! আমি যখন এই ভার সিবিআইকে অনেক আশা নিয়ে দিয়েছিলাম। তদন্ত সেভাবে এগোলে অনেকেই ধরা পড়ত। এখন দেখছি দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি চুপ করে বসে থাকব।” বিচারপতি ওই সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমি মানুষের চোখের জল দেখতে পাই। আমি খুশি, রাজ্যের শিক্ষা দফতর, মুখ্যমন্ত্রী সোমা দাসের ক্ষেত্রে যা পদক্ষেপ নিয়েছেন সেটাই আমি খুশি। অত্যন্ত খুশি।” সাক্ষাৎকারে একের পর বিষয়ে বলতে গিয়ে এমনই সব মন্তব্য করলেন হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়।

তিনি বলেন, “এই অবস্থায় অন্ধকার সুড়ঙ্গে আলো দেখতে পাচ্ছি না, এই মন্তব্য করেছিলাম। পরে সিবিআই নড়েচড়ে বসে। সিবিআই কি সত্যিই খাচাবন্দী পাখি নাকি! ইডি যদি পারে, সিবিআই পারবে না কেন!” এতবার সিবিআই তদন্তের নির্দেশ কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “মুড়ি-মুড়কির মতো দুর্নীতি হয়েছে বলে মুড়ি-মুড়কির মতো সিবিআই দিতে হয়েছে। এত দুর্নীতি!” এবিপি আনন্দের ওই সাক্ষাৎকারে বিচারপতি হুঁশিয়ারির সুরে বলেন, “জালিয়াতি করে স্কুলে যাঁরা ঢুকছেন, এঁরা কী মূল্যবোধ শেখাবে! টুকতে শেখাবে। যাঁরা দুর্নীতি করে ঢুকেছেন প্রত্যেকের চাকরি যাবে। ধরতে পারলেই। তারা যেন নিশ্চিন্তে না থাকে!”

এদিনের ওই আলোচনায় বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় জানান, ”যাঁদের কথা বলছি, তারা প্রভাবশালী। তাই তাঁদের অনেক টাকা। তাই হাজিরায় সময় বেশি দিলে, তথ্য প্রমাণ নষ্ট হতে পারে। তাই নির্দেশে সময় বেঁধে দিয়েছি।” একজন বিচারপতি ইন্টারভিউ দিচ্ছেন? সেটা নিয়ে বিতর্ক হলে, ব্যবস্থা নেওয়া হলে? তাঁর উত্তর, “বেঙ্গালুরু প্রটোকল অনুযায়ী আমি উত্তর দিচ্ছি। সেখানে বলা আছে বিচারপতিরা কী করবেন, তাঁদের বাক্ স্বাধীনতা আছে। আইনি আলোচনায় থাকতে পারেন তাঁরা।” আপনি কি নিজেকে প্রজেক্ট করছেন? বিচারপতির উত্তর, “সবসময় লোপ্রোফাইল মেইনটেন করেছি। এমন সব ঘটনাচক্রে আমি প্রজেক্টেড হয়ে যাচ্ছি। যিনি শক্ত হাতে দুর্নীতির হাল ধরবেন তিনিই এমন হবেন।” বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “দুর্নীতির সঙ্গে আপোস করিনি। আর কোনও আপোসে যাব না। যতটুকু ভদ্রভাবে থাকা যায় সেই ভাবেই থাকব। সুপ্রিম কোর্ট বহিষ্কার করলেও আমি বলব ঠিক করেছি। দুর্নীতি ভারতকে শেষ করে দিয়েছে। ইতিহাস কাউকে মনে রাখে না। আমাকে ও কেউ মনে রাখবে না। আমি বিচারপতি হিসেবে কাজ করেছি। সৎ ভাবে।”

বিচারপতির মন্তব্য, “এই ছেলেগুলির প্রতি অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে। চোখের জলে বালিশ ভেজাচ্ছে। আমি বেদনা বুঝি। রুপোর চামচ নিয়ে জন্মায়নি। চাকরিটা পেলে কত পরিবারের সুরাহা হবে বলুন তো। আমি কোনও কমিশন, ট্রাবুনাল কিছু করব না। অবসরের পর ভালো ভালো বই পরব। আমি বলব না রাজনীতিতে নামব না কোনও দিন। ডাক আসতে পারে। সেটা দলের রাজনীতি হবে এমন নয়। আমি বিশ্বাস করি, সন্ত্রাস মাঝে মাঝে অত্যন্ত ইতিবাচক ফল দেয়। এই সন্ত্রাস আলাদা। আমি জানি আমি বিচার করতে বসে দুর্নীতি রুখতে একটা এমন কিছু তৈরি করতে পেরেছি।” বিচারপতি বলেন, “আমি সৎ। রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই।আমি রাস্তায় বসে বলতে পারি দুর্নীতি-মুক্তির কথা। আমি ভারতের অভিশাপ দেখেছি দুর্নীতিকে।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close