কলামরাজনীতি

সামাজিক মাধ্যমের পরে এবার চলচ্চিত্রকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে মোদী সরকার

লেখক: সুমন সেনগুপ্ত

দেশ জুড়ে এই মুহুর্তে চুড়ান্ত হইচই, সামাজিক মাধ্যমের পরিসর কি আদৌ থাকবে না কি ফেসবুক, টুইটারের মতো মাধ্যমগুলো এই দেশের নতুন আইনের ফলে আর এখানে কাজই করতে পারবে না। সরকারের যুক্তি, এই দেশে ব্যবসা করতে চাইলে, এই দেশের সমস্ত নিয়ম মেনে চলতে হবে। এখন বিষয়টা কি শুধু নিয়ম মানানোর কথা বলা, না কি সরকারের সমালোচনা করার পরিসরকে বন্ধ করে দেওয়াই আসল উদ্দেশ্য তা ভেবে দেখাও অবশ্য কর্তব্য। একদিকে দেখা যাচ্ছে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের একটি প্রথম সারির দৈনিকে উত্তর সম্পাদকীয় লিখছেন যে ইন্দিরা গান্ধীর লাগু করা জরুরী অবস্থার দিনগুলো কত খারাপ ছিল, প্রধানমন্ত্রী ঠিক মনে করিয়ে দিচ্ছেন টুইট করে যে ইন্দিরা স্বৈরতন্ত্র ২৫শে জুন মধ্যরাতে, সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের অধিকার খর্ব করেছিল, আর ওদিকে আইনমন্ত্রী সেই টুইটারকেই হুমকি দিচ্ছেন যে ভারতের আইন মেনে না চললে এখানে আর তাঁরা ব্যবসা করতে পারবেন না।শুধু তাই নয়, টুইটারের কর্তা মণীশ মহেশ্বরী সহ বেশ কিছু সাংবাদিক ও কংগ্রেস নেতাদের বিরুদ্ধে যোগী আদিত্যনাথের সরকার এফআইআর করেছে যে তাঁরা নাকি সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক পোষ্ট দিয়েছেন তাই এরপরের থেকে এই রকম পোষ্ট যে কেউ দিলে টুইটারের বিরুদ্ধেও মামলা করা যাবে। অথচ দিল্লির দাঙ্গার সময়ে কারা উস্কানিমূলক পোষ্ট দিয়েছিল আমরা সবাই জানি। টুইট করে যারা তখন এই রকম উস্কানি দিয়েছিল তাঁরাই আজকে বলছে যে টুইটার পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। মোদ্দা কথা যে কোনও সরকার বিরোধী কথা যে কেউ টুইট করলেই, সরকারের গাত্র দাহ হচ্ছে।

বিষয়টা কিন্তু এই সামাজিক মাধ্যমে থামে নি। তা আপাতত ছড়িয়েছে, সিনেমা ও চলচ্চিত্র জগতেও। নতুন যে সিনেমাটোগ্রাফ আইন আনা হয়েছে, বা বলা ভালো সংশোধন করা হয়েছে, তাতেও মনে হচ্ছে যে মত প্রকাশের অধিকার ও বিরুদ্ধ মত যাতে না উঠে আসে সেই বিষয়ে বেশ ভাল রকম নজর দিয়েছে এই মোদী সরকার। নতুন যে খসড়া প্রকাশিত হয়েছে তা দেখে পরিচালক, প্রযোজক থেকে অভিনেতা অভিনেত্রীরা চমকে উঠেছেন। অনেকেই বলেছেন যে এতো সরকারের হাতে সুপার সেন্সর পাওয়ার বা ক্ষমতা দেওয়া হল। নতুন খসড়াতে বলা হয়েছে সরকার মনে করলে ছাড়পত্র পাওয়া সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ করে দিয়ে ফের তা সেন্সর বোর্ডের কাছে পাঠাতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৫২ সালের যে সিনেমাটোগ্রাফ আইন আছে তাতে আরও একটি ধারা যোগ করতে চাইছে, যে ধারায় বলা আছে যে কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছে করলে সেন্সর বোর্ডের সিদ্ধান্ত অবধি বদলাতে পারে। এখন যে আইন চালু আছে, তাতে কেন্দ্রীয় সরকার সেন্সর বোর্ডের থেকে জানতে চাইতেই পারে কি প্রক্রিয়ায় একটি ছবি সেন্সরের ছাড়পত্র পেল, কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের ফলে একবার সেন্সরের ছাড়পত্র পাওয়া ছবি বা সিনেমা কেন্দ্র আটকাতে পারতো না। কিন্তু নতুন আইনে সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যানকে, ছাড়পত্র পাওয়া ছবিটির আবার পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকার চাইছে।

আগে ছিল ইউ, ইউ-এ, অর্থাৎ ১২ বছরের শিশুদের, অভিভাবকদের তদারকিতে দেখার জন্য এবং এ, অর্থাৎ, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। এখন এখানে আরও কিছু ভাগ আনতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। ইউ/এ-৭+, ইউ/এ- ১৩+ এবং ইউ/এ- ১৬+ এইরকম আরও শ্রেণী বিভাজন আনার প্রস্তাব কেন্দ্রীয় সরকার দিয়েছে। এই নতুন শ্রেণী বিভাগ এবং প্রস্তাব আনার সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে একই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যা সামাজিক মাধ্যমের জন্য দেওয়া হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা ধ্বংস হচ্ছে এমন কোনও ছবি বা দৃশ্য যদি সেন্সরের ছাড়পত্র পাওয়া ছবিতে থাকে তাহলে সেই ছবি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতাও নতুন আইনে কেন্দ্রীয় সরকারের থাকবে। আগে প্রযোজক এবং পরিচালকেরা অসন্তুষ্ট হলে বা সেন্সরের ছাড়পত্র সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন থাকলে ট্রাইব্যুনালে যেতে পারতেন, নতুন আইনে এই ট্রাইব্যুনালই উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এখানেই আসল ভয়।

চলচ্চিত্র জগত থেকে সংযত কারণেই এর বিরোধিতা হয়েছে। বলা হয়েছে যে সামাজিক মাধ্যমে যদি ছোটখাট কোনও বিরোধিতা হয় ছবির যে কোনও দৃশ্য নিয়ে, তাহলে কি সরকার সামাজিক মাধ্যমের কথা শুনে ছবিটি চলতে বাধা দেবে? যদি খেয়াল করা যায়, ঠিক এই ধরনের ঘটনাই ঘটেছিল সাম্প্রতিক ‘পদ্মাবত’ এবং ‘উড়তা পাঞ্জাব’ ছবিটি নিয়ে। তখন কোনও একটি সম্প্রদায়ের ভাবাবেগে আঘাত করা হয়েছে বলে সামাজিক মাধ্যমে শোরগোল পড়েছিল। যদিও আমাদের দেশের মুসলমান জনগোষ্ঠী সম্পর্কে নানান সময়ে যে বিদ্বেষমূলক কথা বিভিন্ন সিনেমাতে দেখানো হয়েছে তা নিয়ে কোনোদিনই কোনও বিরোধিতা আসেনি। সর্বোচ্চ আদালত সবসময়েই কিন্তু প্রযোজক বা পরিচালকদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু নতুন আইনে তা একেবারেই আর সম্ভব হবে না। যদিও এই সেন্সর বোর্ডের একটা ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য চিরকালই ছিল। ব্রিটিশরা মনে করতেন যে গণমাধ্যমের যে সমস্ত কিছু নাড়াচাড়া দেওয়ার রেওয়াজ আছে তার থেকে দেশের মানুষদের দূরে রাখাটা জরুরী। স্বাধীনতার পরেও সেই একই মানসিক অবস্থা রয়ে যাওয়ার ফল হচ্ছে ওই সেন্সর বোর্ড। বিচারপতি মুকুল মুদ্গল এবং পরিচালক শ্যাম বেনেগাল এক সময়ে একটি কমিটির তরফে আক্ষেপ করেছিলেন যে ভারতীয় সিনেমা কবে সাবালক হবে, কবে যে কম কাটাছেঁড়া হবে কে জানে? আর আজ নতুন আইনের ফলে ভারতীয় সিনেমা আরও ঔপনিবেশিক কব্জায় পড়লো। এবারও কিন্তু বেশ কিছু মানুষ বিরোধিতা করেছেন। কমল হাসান, নন্দিতা দাশ, ফারহান আখতার,শাবানা আজমি সহ বহু মানুষ কিন্তু একটাই কথা বলেছেন, আর সেটাই আশার কথা। গণতন্ত্রে আঘাত আসলে তার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামাটাই একমাত্র রাস্তা। আসলে এই নরেন্দ্র মোদী সরকার একদিকে মুখে বলছেন যে তাঁদের সরকার মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে, আর অন্যদিকে এমন আইন আনছেন যে তাতে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থাকেও হার মানাচ্ছে। এই দ্বিচারিতা যত তাড়াতাড়ি আরও সামনে এনে মানুষকে বোঝানো যায় তত ভালো। অঘোষিত জরুরী অবস্থা কি কোনওভাবে ঘোষিত জরুরী অবস্থার থেকে ভালো?

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close