গ্রিন রুম

জীবন্ত জীবনযাপন, প্রেম-যৌনতা-বিচ্ছেদ-মিলনের আঙ্গিকে ভয় ধরাচ্ছে ‘হাওয়া’

রমেন দাস: মরা মরেছে! আতঙ্ক আর চিৎকারের আবহে ভয় ধরাচ্ছিল বারবার। যেন হলভর্তি দর্শকের দিকে তাকিয়ে ‘চান’-ই বারবার বলে দিচ্ছিলেন, ভয় করছে!

নাহ্! এই গল্প ভয় ঠিক যতটা ধরিয়েছে, তার তুলনায় ভাবিয়েছে বেশি। প্রতি মুহূর্তে বিবর্তিত করেছে ভালো কাজের ইতিহাস। ভালো অনুভবের কথকতা। কাহিনির বুনটের সামান্য মন্দটুকু ছাড়িয়ে এই ‘হাওয়া’ ঝড়ই বটে! যা শীতের শুরুতেই কলকাতার আবহাওয়া গরম করতে সার্থক উপজীব্যও।

ঠিক কেমন হল বাংলাদেশের তরুণ পরিচালক মিজবাউর রহমান সুমনের ছবি, চঞ্চল অধিকারী-শরিফুল রাজ অভিনীত ‘হাওয়া’! খতিয়ে দেখতে উপস্থিত হয়েছিলাম বঙ্গের সিনেমা-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র নন্দনে। সেখানেই চলছে চতুর্থ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। আর এই উপলক্ষ্যেই নন্দনজুড়ে আজ থেকেই শুরু হয়েছে বিনামূল্যে ‘হাওয়া’ সিনেমা-সহ বাংলাদেশের একাধিক সিনেমা প্রদর্শন। যার মধ্যে নজর কেড়েছে ‘হাওয়া’।

আর সকাল থেকে লাইন দিয়ে এই সিনেমা দেখতে হাজির বাঙালিও। ওপার বাংলার জনপ্রিয় গানের তালে মেতে হাজার হাজার মানুষের ভিড় নন্দন চত্বরে। কেউ ঢুকতে পারলেন, কেউ আবার সিনেমা হলের মাটিতে বসেই দেখে ফেললেন হাওয়া। যা বঙ্গের সিনেমাকালে নজিরবিহীন! শেষ কবে বাঙালি নন্দনের মেঝেই বসে বাংলা সিনেমা দেখেছে, এ নিয়েও ভাবনার অবকাশ রেখেছেন অনেকেই! আর এই প্রসঙ্গে নন্দনে দাঁড়িয়ে কী বলছেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। তিনি জানান, ”কলকাতায় এত মানুষ এই সিনেমা দেখার জন্য এসেছেন। অনেকে ঢুকতেও পারেননি। আমরা কৃতজ্ঞ। এবার এদেশের সিনেমা হলে এই ছবির মুক্তির বিষয়ে কথা চলছে।”

কী রয়েছে এই সিনেমায়?

হলিউডের ভাষায় রিভিউ লিখতে বসে ‘স্পয়লার’ দেওয়া কতটা যুক্তির বা নীতিগত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও গতিপথ পরিবর্তন করছি এবার। আমার পাঠকের জন্য জানিয়েই দেব সবটা? ঠিক-ভুল ঠিক কী কী রয়েছে এই ছবিতে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলব ফের! ছবির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের প্রাক্-মুহূর্তে তাই দেখে নেওয়া যাক এই ছবির কাহিনি।

ছবির শুরু থেকে শেষের দৃশ্যপট একটি মাছ ধরার বড় ট্রলার। জলেই যার শুরু জলেই আবার শেষ। ছবি শুরু হচ্ছে এক বিরাট জলরাশিকে সামনে রেখে। তাতে টলমল এক ট্রলারের মধ্যে বসে প্রধান মাঝি চান (চঞ্চল চৌধুরী), সঙ্গে মিস্ত্রি ইবা (শরিফুল রাজ), তাঁদের সঙ্গেই রয়েছেন উর্কেশ, পার্কেশ, নাগু, এজা, মরা। এঁরা প্রত্যেকেই জেলে। সকলের পেশা মাছ ধরা। গভীর সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে দিনের পর দিন ডাঙার মানুষের জন্য মাছের জোগান দেওয়া কাজ।

একদিন আচমকা ঝড়-জলের রাতে সমুদ্রে ফেলা জালে উঠল একটি ‘মৃতদেহ’। গল্পের মোচড় শুরু এখান থেকেই। ওই মৃত মহিলাকে নাগু দেখল মাছ! বাকিরা যুবতী মহিলা! পরে দেখা যায় মহিলা জীবন্ত। অন্য বোটের নজর এড়াতে চলল নানা অছিলা। এর মধ্যেই এক মুক মহিলার দিকে আকর্ষিত হয় বহুকাল পরিবার থেকে দূরে থাকা একের পর এক পুরুষ। মাঝিদের মোচ্ছবের অন্তরালে চানের কুনজরে পড়েন ওই রহস্যময়ী। পাল্টা প্রতিরোধে জলে পড়ে চান। এরপর নাগু। একই ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয় সে-ও। এদিকে মিস্ত্রি ইবার সঙ্গে ভাব জমে ওই মহিলার। মধ্যরাতে মাঝ সমুদ্রে নেমে রহস্যময়ীর স্নানপর্বের মাধ্যমে ইবা জানতে পারে রহস্য। দু’জনের মধ্যে তৈরি হয় টান। ভালোবাসা। ইবা জানতে পারে, ওই যুবতী আসলে কথা বলতে জানে। তার নাম গুলতি। সে মানুষ নয় আবার মানুষের মতো! মাছ কিম্বা সাপ! তার উদ্দেশ্য চানকে শেষ করা। একদা ডাকাতের সর্দার চানের হাতে গুলতির বাবা খুন হয়েছিল সেই প্রতিশোধ নেবে সে।

এদিকে মাছের দেখা নেই। ট্রলার খারাপ। সবমিলিয়ে বিরক্ত চান ফেরার তোরজোড় শুরু করল। অপয়া অপবাদে ব্যতিব্যস্ত হল গুলতি। সকলেই তখনও জানে সে কথা বলতে পারে না। একদিন গুলতিকে জলে ফেলার উপক্রম হতেই প্রতিবাদ করল ইবা। শুরু হল সংঘর্ষ। চানের হাতে খুন হল ইবা। বাঁধন খুলে পালিয়ে গেল গুলতি। ইবার মৃতদেহ তুলতে গিয়ে আকস্মিক মৃত্যু হল মরা-র। উর্কেশ মরল জলে ঝাঁপ দিয়ে। আহত, কাতরাতে থাকা ইজাকে খুন করল চান। একের পর মৃত্যুতে তখন বেঁচে শুধু চান আর নাগু। মড়ক লাগল বোটে। একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ চানও আজ একা! শেষ হল সব।

ইবার দেহ সরাতে গিয়ে সাপের কামড়ে মৃত্যু হল চানের। মারা গেল নাগুও। নাগিনী গুলতির স্পর্শ পেল মৃত ইবা। দু’জনের অযাচিত মিলনে চলল মাঝিহীন বোট! মিলন হল ওদের। ভালোবাসার স্পর্শ পেল দুই শরীর।

সিনেমার শুরু থেকে শেষের দৃশ্যপট এবং কাহিনির বুনন চিরাচরিত। সেই অতৃপ্ত ভালোবাসা, মিলন। ভিলেন, নায়ক। ভালোবাসার বাঁধা। গতে বাঁধা চিরাচরিত সিনেমাসুলভ সবটা চললেও এই কাহিনি ভিন্ন। এ ছবিকে যদি সমালোচনার উর্ধ্বেও বলা হয়, তবে কম বলা হয় না হয়তো!

কেন? আমরা যদি কয়েকটি বিশেষ দিকে আলোকপাত করি, তাহলে যা দাঁড়ায়;

দৃশ্যপট

জলেই শেষ, জলেই শুরু। প্রায় ২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে পরিচালক তাঁর মৌলিক ভাবনায় এই ছবির সম্পূর্ণ গতিপথ চালিত করেছেন জলেই। বিপুল জলরাশি আর নীল রঙের জল-আবহে ছবি আবর্তিত হয়েছে। দিন থেকে রাত, প্রত্যেকটি ভাবনার ক্ষেত্র, এই ছবিকে ঘিরে রেখেছে জল। যা মৌলিক, অনবদ্য, অসাধারণ।

ক্যামেরার ব্যবহার

জলে জাল ফেলা থেকে জলের তলার দৃশ্য। নৌকার নোঙর থেকে শুরু করে ঝড়-বৃষ্টির দৃশ্য। প্রত্যেকটি ভাবনা এবং চরিত্র জীবন্ত করেছে এই ছবির ক্যামেরার কাজ। একের পর এক টুকরো টুকরো ছবির কোলাজে হাওয়া গরম করতে এর ক্যামেরার ব্যবহার অসাধারণ।

আবহ-সম্পাদনা

প্রত্যেক মুহূর্তে ছবিকে একটি ছোট গণ্ডির মধ্যে রেখেও এর আবহের ব্যবহার জীবন্ত করেছে সবটা। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ছবিতে মাত্র একটি সঙ্গীত ব্যবহার করলেও এর আবহ সঙ্গীত, একজন দর্শককে টানা বসিয়ে রাখতে ঠিক যেমন করা উচিৎ, তার থেকেও অনেক উন্নত। যা কাহিনির ওঠানামার সঙ্গে সমান প্রাসঙ্গিক।

অভিনয়

শুধুমাত্র চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় নয়, এই ছবিতে ইবার চরিত্রে শরিফুল রাজও অনবদ্য। নাগু থেকে গুলতি, প্রত্যেকেই খামতি রাখেননি অভিনয়ে। দক্ষ অভিনেতাদের মিশেলে এই ছবির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ত্রুটি ঢেকে গিয়েছে নিমেষেই। বারবার একাধিক অভিনেতার মিলিত অভিনয়-প্রয়াসে জীবন্ত হয়ে উঠেছে হাওয়া।

রূপসজ্জা

প্রত্যেক চরিত্রকে মাটির কাছাকাছি করেছে প্রত্যেকের চরিত্রের সঙ্গে আনুষঙ্গিক সাজ। মাঝি-মল্লার। সমাজের একটা পেশা, দিনের পর দিন লড়াই, যুদ্ধ। স্বল্প পরিমাণ আতিশয্য, অতি সাধারণ পোশাকের ব্যবহার আর সাজের ক্ষেত্র এক মুহূর্তেও চরিত্রকে সাজানো বানাতে দেয়নি। যেখানে খুনোখুনি পর্বের রক্ত থেকে চানের দাঁত, সব ক্ষেত্রেই অনবদ্য থেকেছে এই ছবি।

ভাষার ব্যবহার

এই ছবির আর একটি বিশেষ দিক, এখানে ব্যবহৃত ভাষা। মূলত, আঞ্চলিক ভাষা এবং মাঝি-জেলেদের জীবনযাপনের নিত্যনৈমিত্তিক অশালীন বক্তব্যের ব্যবহার যেন এক মুহূর্তেও বুঝতে দেয়নি, ওঁরা অভিনেতা। দর্শককে বুঝতে দিয়েছেন ওঁরাই আসলে জেলে। যেন সামনেই দেখা যাচ্ছে সমুদ্র আর একটি ট্রলার। দর্শকের সামনেই ঘটছে সবটা। যেখানে মাগী থেকে শুরু করে চুত মারানী; ব্যবহৃত হয়েছে অবাধে।

হাস্যরস

প্রথম থেকেই পরিচালক বিরাম দিয়েছেন দর্শককে। অলৌকিকতার মিশেলের প্রকাশে, রহস্য আর রক্তের রোমাঞ্চের মধ্যেও ক্ষণে ক্ষণে রয়েছে হাসির উপাদেয়। যেখানে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই যেন অভিনেতাদের দিয়ে সংযোগ স্থাপন হয়েছে দর্শকের।

ক্লাইম্যাক্স

সাধারণ এক জীবনযাপনের মধ্যে রহস্যে মোড়া নারীর উপস্থিতি। তাঁকে ঘিরেই মাছ ধরার জীবন থেকে কাহিনির রহস্যের দিকে ঘুরে যাওয়া এই ছবির ইউএসপি।

প্রেম

এক নিম্নবর্গীয় সমাজ। মাটির কাছাকাছি থাকা, সভ্য সমাজ থেকে খানিকটা দূরবর্তী এক অংশের জীবনে প্রেম। কামের বিচ্ছুরণ। নারী-যৌনতা। আবার তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকা এক প্রেমকাহিনি। এক প্রতিশোধের মায়াবী আলোয় মিলনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা, এই ছবিকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। যেখানে প্রেম, যৌনতা এবং বিচ্ছেদ-প্রতিশোধের আগুনও জ্বলেছে নিরন্তর।

ত্রুটি

তড়িঘড়ি কাহিনির চলমানতা আর গল্পের বুননে একটু কাঠিন্যের অভাব ছাড়া, এই ছবির সমস্ত ত্রুটি তুচ্ছ। কারণ এর সামগ্রিক প্রকাশ মৌলিক, মারাত্মক। যা একজন দর্শককে ঠিক যে যে কারণে হলমুখী হতে বাধ্য করে, সবটাই রয়েছে এখানে।
তাই, কলকাতার হাওয়া গরম এবং নন্দনের বিপুল লাইন দেওয়া যে খুব একটা বৃথা নয়, একথা বলাই যায়।

আমাদের তরফে হাওয়া পেল; ৮.৩/১০

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close