মহানগর

মরণোত্তর চক্ষুদান করলে শ্মশান যাত্রীদের বিনামূল্যে শ্মশান পৌঁছে দেন দরিদ্র ম্যাটাডোর চালক

অভিজিৎ দাস: বাড়ির উল্টো দিকে দাঁড় করানো একটি টাটা ৪০৭ গাড়ি। তাতে যা লেখা তার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় মানুষের সেবাই ঈশ্বরের সেবা। নিচে মরণোত্তর চক্ষুদান করার আবেদন। সারাদিন এই গাড়িটি চালিয়েই কোনমতে নিজের সংসার চালান উত্তর কলকাতার পাইক পাড়ার বাসিন্দা বছর ৫৩-এর গৌতম কুণ্ডু। কখনও এই ম্যাটাডরে করে দূর দুরান্তে মাল সাপ্লাই-এর কাজ করেন, আবার নিমতলা শ্মশান ঘাটে পৌঁছে দেন শ্মশান যাত্রীদের। তবে মৃত ব্যক্তির চক্ষুদান করলে সেই পরিবারের কাছ থেকে গাড়ি ভাড়া বাবদ একটি পয়সাও নেন না তিনি। পৌঁছে দেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এছাড়াও রাত বিরেতে যেকোনো মানুষের আপদে বিপদে ছুটে চলেছেন তাঁদের সাহায্যার্থে। কাউকে পৌঁছে দিচ্ছেন হাসপাতালে, রাত জেগে সেবা করছেন, আবার কারুর চিকিৎসার খরচ জোগাড় করার চেষ্টায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন দরজায় দরজায়।

নোটবন্দি ও জিএসটি অনেক আগেই থাবা বসিয়েছে তাঁর সচ্ছল রোজগারে। এবার নতুন সংযোজন মারণ করোনা ভাইরাস। রোজগার এসে ঠেকেছে একেবারে তলানিতে। কিন্তু তাঁর মধ্যেও আপদে বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় কোন ছেঁদ পড়েনি। এরই মধ্যে জোর কদমে চলছে চক্ষুদানের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার কাজ।

আর্থিক অনটনের কারণে মাঝপথেই বন্ধ করতে হয়েছিল পড়াশোনা। এছাড়াও ভাল ফুটবল খেলতেন। কিন্তু সংসারে টাকা জোগানোর চেষ্টায় সেই খেলাতেও আর সময় দিতে পারেননি গৌতম বাবু। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাদার ডেয়ারির দুধ ডেলিভারি দিয়ে শুরু। তারপর নিজের গাড়ি কিনে তা চালানো শুরু করেন তিনি।

চক্ষুদানের পরিবর্তে বিনামূল্যে শ্মশানে পৌঁছে দেওয়া কবে থেকে শুরু করলেন?

জবাবে গৌতম বাবু জানান, “বছর চারেক আগে এক মৃত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে তার ছেলেকে চক্ষুদানের কথা বলতে তিনি ইতস্তত করতে থাকেন। সেই সময় আমি তাঁকে বলি যে চক্ষুদান করলে আমি বিনামূল্যে তাঁদের শ্মশানে নিয়ে যাব। তিনি এক কথায় রাজি হয়ে যান।” চক্ষুদান করলে একদিকে যেমন তিনি বিনামূল্যে পরিষেবা প্রদান করেন, অন্যদিকে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা চক্ষুদান করার পরও তাঁকে গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে দিয়েছেন। “আগের তুলনায় এখন মানুষ চক্ষুদান সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। তবে সরকারের উচিৎ সচেতনতা বাড়াতে আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করা।”

স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে ছোট্ট সংসার গৌতম বাবুর। ছেলে প্রিতমকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন। পড়িয়েছেন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এমবিএ। সে এখন একটি নামি জুতো প্রস্তুতকারক সংস্থায় কর্মরত। বাবার এই কাজে পূর্ণ সমর্থন রয়েছে তার। “ছোটবেলা থেকে বাবাই শিখিয়েছেন কিভাবে মানুষের পাশে দাড়াতে হয়। এবার আমি বাবার পাশে দাড়াতে চাই।”

তবে জীবনের এই লড়াইয়ে সব থেকে বেশি পাশে পেয়েছেন স্ত্রী প্রীতি কে। পেছন থেকে নিরন্তর সাহস ও সাহায্য করে গেছেন। আর পাশে পেয়েছেন পাড়া প্রতিবেশি ও বন্ধুবান্ধবদের। যারা রাত বিরেতেও তার এক ডাকে এসে হাজির হন। যে যার সাধ্য মত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। আর তাই দিয়েই সর্বক্ষণ মানুষের স্বার্থে ছুটে চলছেন পাইকপাড়ার গৌতম কুণ্ডু।

 

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close