ফিচার

খুপরি কাঠের ঘর, খাট কেনার পয়সা নেই! ‘জিরো থেকেই হিরো’ হয়েছিলেন জেমস বন্ড

হলিউডের মোহময়ী পরিবেশে ঝলমল করতে থাকা মানুষগুলোকে দেখে আমরা ভাবি কী অপরিসীম সুখের হাতছানি পেয়েছে তারা। হলিউডের নৈশ জীবন গোটা পৃথিবী জোড়া মানুষের কাছে হাতছানির কারণ হয়ে থেকে গিয়েছে আজ‌ও। আর ষাটের দশকে পৃথিবীর প্রধান রঙিন জগত বললে সবাই বোধহয় হলিউডকেই বুঝত। আর শন কনারি ছিলেন এই চকচকে রঙিন হলিউডের সবচেয়ে সফল মানুষগুলোর একজন।

থমাস শন কনারি। থমাস নামটা দেওয়া হয়েছিল তার ঠাকুরদার নামানুসারে। যার জীবনের গল্প নিয়েই হয়ে যেতে পারে একটা ব্লাবাস্টার হলিউডের সিনেমা। শন কনারির জন্মের সময় স্বয়ং বিধাতাও বোধহয় তার এই রূপকথাময় যাত্রাপথের কথা ভেবে উঠতে পারেননি! আসলে পারেননি নয়, ভেবে উঠতে পারা কারোর পক্ষেই সম্ভব ছিল না। ২৫ আগস্ট ১৯৩০ সালে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ শহরের এক বস্তি অঞ্চলে তার জন্ম। ফাউন্টেনব্রিজের ওই বস্তিতে একটা খুপরি কাঠের ঘরে থাকতেন শন কনারির মা বাবা। বাথরুম ছিল ভাগের। তিনটে পরিবার ভাগ করে ব্যবহার করত ওই বাথরুম। এই পরিবেশেই জন্ম থমাস শন কনারির।

কখনো রবার ফ্যাক্টরি অস্থায়ী শ্রমিকের কাজ, আবার কখনো লরির ড্রাইভারি করা বাবার পক্ষে সম্ভব ছিলনা তার জন্য একটা খাট কিনে দেওয়ার। তার ফলে সদ্যোজাত কনারিকে মেঝেতেই একটা কাঠের পাটাতনের ওপর ঘুমোতে হত। সংসারের অভাবের তাড়নায় তার মা লোকের বাড়ি ঠিকে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই অবস্থায় পড়াশোনা খুব বেশিদিন করা সম্ভব হয়নি কনারির পক্ষে। তার মধ্যেও যে যেটুকু পড়াশোনা করেছেন, সেই খরচ চালানোর জন্য দুধ বিক্রি পর্যন্ত করতে হয়েছে এই প্রবাদপ্রতিম হলিউড অভিনেতাকে। এর পর মাত্র ১৬ বছর বয়সে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভিতে যোগ দেন তিনি। কিন্তু সে চাকরিও বেশিদিন করতে পারেননি শারীরিক দুর্বলতার কারণে। মাত্র তিন বছর পর রয়্যাল নেভির চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।

তার জীবনের মোড় ঘোরে লন্ডনে আয়োজিত একটি দেহ সৌষ্ঠব প্রতিযোগিতা থেকে। ওই প্রতিযোগিতায় তেমন একটা সাফল্য না পেলেও তার সু-উচ্চতা ও চেহারার আকর্ষণীয় ক্ষমতা নজরে পড়ে যায় একজন নাট্য প্রযোজকের। এরপর তিনি লন্ডনের ওই নাটকের দলে যোগদান করেন। যার মধ্য দিয়ে তার অভিনয় জীবনের সূত্রপাত ঘটে। এর কিছুদিন পরেই তিনি ইংল্যান্ডের টেলিভিশনে ছোটখাটো কিছু কাজ করতে শুরু করেন।

শন কনারির অভিনয় জীবন যখন গড়পড়তা একটা পথে এগোচ্ছে তখনই এক অত্যাশ্চর্য প্রস্তাব পান তিনি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাবের তৎকালীন কোচ ম্যাট বুশবি শন কনারিকে তার দলে সই করাতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। আসলে অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভিনেতা ফুটবল খেলাও জোরকদমে চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময়ে ম্যানচেস্টার তাকে সপ্তাহে ২৫ পাউন্ড বেতনের প্রস্তাব দিয়েছিল, যা ওই সময়ে শন কনারির কাছে বেশ অনেকটা হলেও তিনি শেষ পর্যন্ত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে সই করেননি। এর কারণ হিসেবে তার আত্মজীবনীতে বেশ মজার একটা কথা লিখে গিয়েছেন এই প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা। সেখানে তিনি বলেছেন “আমার কাছে দুটো অপশন ছিল ফুটবল খেলা, না হলে অভিনয় করা। আমি ভেবে দেখলাম মোটামুটি ৩০ বছর বয়সের পর থেকে ফুটবলারদের কেরিয়ার শেষের পথে হাটা শুরু করে দেয়। আর তখনই আমার বয়স ছিল ২৩ বছর। তাই আমি অভিনেতা হবো বলে ঠিক করলাম। আর আজ প্রমাণিত আমার জীবনে নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত গুলোর মধ্যে এটাও একটা।”

জীবনে প্রভূত সাফল্য পেলেও, বস্তি থেকে রাজপ্রাসাদের শীর্ষে উত্তরণের সৌভাগ্যের অধিকারী হয়েও শিকড়ের কথা কখনোই ভুলে যাননি শন কনারি। তিনি বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন তার স্কটিশ জন্ম পরিচয় এক মুহূর্তের জন্যেও ভুলতে পারেন না। অনেকেই হয়তো যে তথ্য জানেন না শন কনারি রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীন স্কটল্যান্ডের দাবী, অর্থাৎ গ্রেট ব্রিটেন থেকে আলাদা হয়ে গিয়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। এই অভিনেতা মধ্য-বামপন্থী স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির সদস্য ছিলেন। তিনি প্রতি মাসে তার দলকে পাঁচ হাজার পাউন্ডের মতো মোটা অঙ্কের অর্থ অনুদান হিসাবে পাঠাতেন।

২০১১ সালে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবিতে যখন গণভোট অনুষ্ঠিত হয় সেই সময় শন কনারি মন্তব্য করেছিলেন “নতুন দেশ গড়ার আনন্দই আলাদা।” যদিও তার সেই আশা সফল হয়নি। ঠিক যেমন সফল হয়নি তার জেমস বন্ড পরিচয়ের তকমা ঝেড়ে ফেলার শত প্রচেষ্টা!

যে জেমস বন্ড চরিত্রে অভিনয় করার মধ্য দিয়ে হলিউডের বেতাজ বাদশাতে পরিণত হয়েছিলেন এই স্কটিশ অভিনেতা, সেই বন্ড চরিত্রকেই মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন তিনি ! তার আত্মজীবনীতে তিনি বার বার উল্লেখ করেছেন কিভাবে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এই পরিচিতি ঝেড়ে ফেলার। ইয়ান ফ্লেমিং এর লেখা কাল্পনিক সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট জেমস বন্ডকে প্রথম পর্দায় রূপ দেন শন কনারি। তিনি বন্ড সিরিজের মোট সাতটা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন এবং সবকটাই ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক সফল হয়েছিল। কিন্তু এরপরও প্রযোজকদের অফার থাকা সত্ত্বেও ০০৭ পরিচিতি ঝেড়ে ফেলার জন্য তিতি বিরক্ত কনারি আর বন্ড সিরিজে অভিনয় করেননি। “জেমস বন্ড” পরিচিতির ওপর তার এতই ক্ষোভ ছিল যে তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন তার প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়ার কারণ এই চলচ্চিত্রগুলি। তবে তার সেরা অভিনয়গুলো বন্ড সিরিজের বাইরের চলচ্চিত্রগুলোতেই যে ছড়িয়ে আছে সেটা অনিশীকার্য। পরবর্তীতে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার অস্কার পান তিনি। একইসঙ্গে বাফটা ও গোল্ডেন গ্লোব পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ২০০৩ সালে শেষ চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেন।

তবে এই বর্ষীয়ান অভিনেতাকে নিয়ে বিতর্কের ঢেউ কম ওঠেনি। যে স্কটিশ আত্মপরিচয় নিয়ে তিনি এত গর্বিত ছিলেন, সেই তিনি কিন্তু সাফল্যের পর স্পেন এবং পরবর্তী জীবন বাহামাসে কাটিয়েছেন। সমালোচকরা বলেন কর ফাঁকি দেওয়ার জন্যই স্কটল্যান্ডে অর্থাৎ ব্রিটেনে বসবাসের জন্য তিনি আর ফিরে আসেননি। তার নাইটহুড উপাধি পাওয়া নিয়েও বিতর্ক আছে। অভিযোগ স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির চাপে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়েছিল তাকে নাইটহুড উপাধি প্রদান করতে।

অতীতকে ভুলতে না পারা কানারি বলতেন তার কাছে স্নান করা আজও সেরা বিলাসিতা। এই প্রসঙ্গে তিনি তার ছোটবেলার দুর্বিষহ দিনগুলোর কথা উল্লেখ করতেন। যে সময় সুযোগের অভাবে সপ্তাহে মাত্র একদিন স্নান করতে পারতেন। সেই ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল একটা বাথটবের। পরবর্তীতে বাথটবের স্বপ্নই শুধু নয়, বিলাসবহুল জীবনে মেতে যাওয়ার সুযোগ পেলেও ০০৭ এর তকমা ঝেড়ে ফেলতে পারেননি। যা তার কাছে অসহ্য ঠেকলেও অগণিত ভক্তদের কাছে এটাই ছিল তার প্রধান পরিচয়।

বাহামাস দ্বীপে অবসর জীবন কাটানোর ফাঁকে ৩১ অক্টোবর ঘুমের মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন স্যার শন কনারি। জেমস বন্ড চলে গেলেও তার অভিযানগুলো আজো কোটি কোটি ভক্তকুলের স্মৃতির মণিকোঠায় উজ্জ্বল হয়ে থেকে গিয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close