খবররাজ্য

দুর্নীতিতে ‘মাস্টারমাইন্ড’ মানিকজোড় কি শান্তি প্রসাদ-কল্যাণময়? কী বলছে তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদন: ঠিক যেন লভ স্টোরি! থুড়ি, ঠিক যেন দুর্নীতির প্রেমকাহিনি! আবার অনেকেই বলছেন, না না! এটি আসলে যেন দুর্নীতির এক জবরদস্ত ফুটবল টিম! এখানে ১১ জন নেই। রয়েছেন মাত্র ৫-৬ জন! একদিকে দাঁড়িয়ে আছেন গোলকিপার। সমগ্র মাঠজুড়ে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করে রুদ্ধশ্বাসে কাজ সারছেন বাকিরা। নাহ্, আসলে কোনও খেলার কথা বলছি না আমরা। যা বলছি, আমি-আপনি সকলেই হয়তো অবগত। বলছি, রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির কথা। তার দোসর; গ্রুপ সি, গ্রুপ ডি নিয়োগ নিয়ে ‘দুর্নীতির দলে’র কথা।

সমগ্র ঘটনা পরম্পরা যেন একটি নিয়মনিষ্ঠ, নিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনাতে কাজ করেছে বারবার! যেন একটি দল, আর তার মাথা একজন। তার সঙ্গেই একাধিক সহযোগীর কৃতিত্বে জয় পেয়েছে বারবার। আর সেই দলের আসল মাথা কে, তা এখনও স্পষ্ট জানা না গেলেও শান্তি প্রসাদ সিনহা, কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়রা যে ছিলেন অন্যতম সদস্য, তা প্রায় নিশ্চিত! এখানেই অভিযোগ উঠছে, তাহলে কি এই দুই মাথার কারসাজিতেই বিনা বাধায় চলত কাজ! একের পর এক নিয়োগ হয়ে যেত শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে? আর সেই সংঘটিত কাজে (অপরাধ) সাহায্য করতেন, অনুগত সৈনিক হিসেবে কাজ করতেন অশোক সাহা, সমরজিৎ আচার্য, সৌমিত্র সরকাররা? আমরা তুলছি না এই প্রশ্ন। এমন আভাস পাওয়া গিয়েছিল ‘বাগ কমিটি’র রিপোর্টে (Bag Committee)

কী এই বাগ কমিটির রিপোর্ট? গত মে মাসে এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় (গ্রুপ সি) কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে একটি রিপোর্ট জমা দেয় ওই কমিটি। যে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয় আদালত। প্রাক্তন বিচারপতি রঞ্জিত কুমার বাগ, স্কুল শিক্ষা পর্ষদের সদস্য আশুতোষ ঘোষ, রাজ্যের সহ-সচিব পদমর্যাদার আধিকারিক পারমিতা রায়, আইনজীবী অরুণাভ ঘোষ ছিলেন ওই কমিটিতে। যে তদন্তে উঠে আসে বিস্ফোরক সব তথ্য। দেখা যায়, শুধুই শিক্ষক নিয়োগ নয়, অশিক্ষক কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও হয়েছে দেদার অনিয়ম। ভুয়ো নিয়োগপত্র দিয়ে চাকরি দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহারে স্বাক্ষর জালের কথাও উল্লেখ করা হয় ওই রিপোর্টে। যেখানে ৩৮১ -এর বেশি নিয়োগপত্র ঠিক নয় বলে দাবি করে, এসএসসি-র প্রাক্তন উপদেষ্টা শান্তিপ্রসাদ সিনহা-সহ একাধিক আধিকারিকের নাম উল্লেখ করা হয়। এরপরেই ফের নড়েচড়ে বসে আদালত। তদন্তভার যায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে। অভিযোগ দায়ের হয় অভিযুক্ত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে। এদিকে বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের (Justice Abhijit Ganguly) এজলাসে উঠতে থাকে নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে একের পর মামলা। সেই মামলার রায়ে আরও বিপাকে পড়েন অভিযুক্তরা।

প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ, একাধিক টালবাহানার পরে ১০ আগস্ট গ্রেফতার হন শান্তি প্রসাদ সিনহা (Shanti Prasad Sinha)। এরপরেই প্রাক্তন এসএসসি সচিব অশোক সাহাকে গ্রেফতার করে সিবিআই (CBI)। এদিকে তার আগেই শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি এবং বিপুল টাকা উদ্ধারের ঘটনায় ইডি-র হাতে গ্রেফতার হয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় (Pattha Chatterjee) এবং তাঁর বান্ধবী অর্পিত মুখোপাধ্যায় (Arpita Mukherjee)। যাঁর ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয়েছে কোটি কোটি টাকা! এদিকে শান্তি প্রসাদের পরেই এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে প্রদীপ সিংহ নামে এক ‘মিডলম্যান’কে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, এসএসসি-র প্রাক্তন প্রধান সুবীরেশ ভট্টাচার্যকে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই এবার গ্রেফতার হলেন মধ্যশিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতি। কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায় রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বলেও জানা যায়।

এখানেই ফের মাথাচাড়া দিয়েছে ‘বাগ কমিটি’র সেই রিপোর্টের প্রাসঙ্গিকতা। যেখানে ঠিক যেভাবে একটি পরিকল্পিত দলগত অপরাধের কথা বলা হয়েছিল। যাঁদের যাঁদের লীলাখেলার কথা বলা হয়েছিল, সিবিআই গতিপথে এক এক করে জালবন্দি হচ্ছেন তাঁরাই। অর্থাৎ যে দলের সদস্যরা পাকা খেলোয়াড়ের মতো দুর্নীতির গোল করে গিয়েছেন দিনের পর দিন! প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সই থেকে শুরু করে ভুয়ো নিয়োগপত্র তৈরিতে একটুও ভুল করেননি বারবার। তাঁরাই এবার দুর্নীতি ভুলের ফাঁদে পা দিচ্ছেন! যেখানে প্রায় বৃদ্ধ শান্তি প্রসাদের দুর্নীতি-শান্তিতে হাত বাড়িয়েছেন কল্যাণময়? কল্যাণমূলক কাজের পরিবর্তে ভরা মাঠে বল পৌঁছে দিয়েছেন শান্তি-র কাছে অথবা অন্য কারওর কাছে! তাহলে কি এসএসসি দুর্নীতির প্রখ্যাত মানিকজোড় ধরা পরতেই অন্য কোনও ‘মানিকে’র মনেও শঙ্কার মেঘ! প্রশ্ন উঠছে এখানেও।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close