কলামকথা ও কাহিনী

বুদ্ধং ‘স্মরণং’ গচ্ছামি! শুভেন্দুর বুদ্ধস্তুতি-র আবহে লুকিয়ে কোন রাজনৈতিক কৌশল?

রমেন দাস

বুদ্ধং ‘স্মরণম’ গচ্ছামি! রণে-বনে-জলে-জঙ্গলে এবং বঙ্গের রাজনীতিতে বুদ্ধের শরণ নয়, আজ যেন স্মরণে ব্যস্ত রাজনৈতিক নেতারা। একদা প্রবল বিরোধী, বুদ্ধ-বিদায়ে মন্ত্রী হওয়া নেতাদের মুখেই আজ বুদ্ধস্তুতি! ঠিক ধরেছেন, আমরা গৌতম বুদ্ধ নয়, বলছি রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের (Buddhadeb Bhattacharjee) কথা। তিনি মহাকরণ ছেড়ে চলে গিয়েছেন বছর দশেক আগে। ক্ষমতা তো বটেই রাজনীতির অলিন্দ থেকে বুদ্ধ-বিদায় ঘটেছে এক দশকের বেশি। কিন্তু সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি এখনও প্রাসঙ্গিক। এখনও বাম ছত্রে-ছত্রে মহীয়ান ‘আইকন বুদ্ধ’। কিন্তু বিরোধীরা? যে বাম-বিরোধীরা একটা সময় বুদ্ধের নামে খাবি খেতেন, তাঁর ‘কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ স্লোগানে হিল্লোল তুলতেন রাজপথে! তাঁরা?

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাবলী এবং তার গতিপথ ফের আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে পাম অ্যাভিনিউয়ের ছোট্ট ফ্ল্যাটের বাসিন্দার নাম। কেন? মঙ্গলবার বিজেপি-র ডাকে হয় নবান্ন অভিযান। ধুন্ধুমার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এই অভিযানকে কেন্দ্র করে। একাধিক বিতর্ক, লালবাজারে শুভেন্দু(Suvendu Adhikari) শেষ বুধবার। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা, প্রাক্তন তৃণমূল নেতা এবং বর্তমানে বঙ্গ-বিজেপির ‘মুখ’ শুভেন্দু অধিকারী বললেন, “আমি কোনও পরিবারের পরিচয় দিয়ে রাজনীতি করি না। বিরোধী রাজনীতি করেছি সিপিএমের সময় থেকে। আর কেউ না জানুক, সম্মানীয় সৎ রাজনীতিবিদ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য জানেন। আমি ওঁর সরকারের বিরুদ্ধে কী রকম লড়াই করেছি, উনি জানেন। পশ্চিমবঙ্গের যে কয়েকজন সৎ মুখ্যমন্ত্রী আছেন, রাজনীতিবিদ আছেন তাঁদের মধ্যে উনি একজন।”

মানে! শুভেন্দুর(Suvendu Adhikari) এই মন্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই চমকে গিয়েছে রাজনৈতিক মহল। স্তম্ভিত তাঁর পুরনো দলের সহকর্মীরাও। যে শুভেন্দু অধিকারী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ৩৪ বছরের বাম সরকারের ভিত্তি নড়বড়ে হয়েছিল। যে শুভেন্দু-বিরোধিতার তীরে গোটা পূর্ব মেদিনীপুর, লক্ষ্মণ শেঠদের হিমশিম খেতে হয়েছিল। যে শুভেন্দু-আক্রমণে রাজনৈতিকভাবে পরাস্ত হতে হয়েছিল বুদ্ধদেবের দলকে। সেই শুভেন্দু অধিকারীর মুখেই বুদ্ধ-প্রশংসা!

আলোচনা, বিতর্ক এবং বিশ্লেষণের আবহে যদি পর্যবেক্ষণ করা যায়, তাহলে এই গতিপথ অর্থাৎ বিরোধীদের মুখে বুদ্ধ-প্রশংসার ইতিহাস নতুন নয়। এর আবহ রয়েছে আজ থেকে কয়েক বছর আগেই। ২০১১ সাল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে উঠে দাঁড়িয়েছেন মমতা (Mamata Banerjee)। বিশ্বজোড়া আলোচনার আবহেই মমতা-শপথে ডাক পড়ল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসুদের। তাঁরা যাবেন কি যাবেন না, এই দুবিধার মধ্যেই তৃণমূল সরকারের শপথের দিন হাজির হলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসুরা। শাসকের বিরোধীদের উপর আক্রমণের ভুরি ভুরি অভিযোগের মধ্যেই সেই থেকে শুরু রাজনৈতিক সৌজন্যের। যে মমতা একটা সময় মূলত বুদ্ধ-বিরোধিতার অস্ত্রেই রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন, সেই মমতার মুখ্যমন্ত্রী-সত্তাকে বারবার দেখা গিয়েছে সৌজন্য দেখাতে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ফ্ল্যাট তড়িঘড়ি সারিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে বুদ্ধ-অসুখে খোঁজ, হাসপাতালে দেখতে যাওয়া; চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি শুভেন্দুর (Suvendu Adhikari) প্রাক্তন ‘বস্’। যার প্রভাব পরিলক্ষিত হয় ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনের আগেও। বারুইপুরের এক সভা থেকে মমতা বলেন, ”সব সিপিএম খারাপ নয়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বিজেপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।”

শুধু মমতাই নন, তাঁর দলের নেতা মদন মিত্রের (Madan Mitra) গলাতেও শোনা গিয়েছে বুদ্ধের প্রশংসা। এমনকি বিজেপির দিলীপ ঘোষের (Dilip Ghosh) মুখেও পরোক্ষে সিপিএমের (CPIM) এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্তুতি প্রকাশিত হয়েছে। এখানেই উঠছে প্রশ্ন, কেন বাম নেতা, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশীতিপর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বারবার উঠে আসছেন ওঁদের মুখে?

আরও পড়ুন : ‘চা, ঝালমুড়ি, ঘুগনি নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন, পুজোয় বিক্রি করেও শেষ হবেনা’, পরামর্শ মমতার

২০০৬ সাল। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবি। মাত্র ৩০ আসনে জয়, পরে উপনির্বাচনে জয় আসে ৫ আসনে। আর বামেরা পেল ২৩৫। আমরা-ওরা বুদ্ধ-দম্ভের অভিযোগের মধ্যেই মমতার মুখ রাখলেন একজন। পূর্ব মেদিনীপুর। বামেদের শক্ত ঘাঁটি। লক্ষ্মণ শেঠের মতো পরাক্রমশালী বাম নেতাকে সরিয়ে কাঁথি দক্ষিণের বিধায়ক নির্বাচিত হলেন শুভেন্দু অধিকারী। মাত্র ২৫ বছর বয়সে, ১৯৯৫ সালে কংগ্রেসের হয়ে কন্টাই পৌরসভার কাউন্সিলর শুভেন্দু, হলেন বিধায়ক। অধিকারী পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব এবং শুভেন্দু ক্যারিশমা মমতার আরও নিকটে আনল ওই নেতাকে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে প্রায় নুইয়ে পড়া তৃণমূলের সামনে লটারির টিকিটের মতো হাজির হল নতুন নন্দীগ্রাম (Nandigram)। খবর চাউর হল, ইন্দোনেশিয়ার সালিম গোষ্ঠীর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের তকমা দিয়ে নন্দীগ্রামে তৈরি হবে কেমিক্যাল হাব। জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। গুজব আর খানিকটা সত্যির যাঁতাকলে নিশ্বাস নিল ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’। কার্তিক পাল, সিপিআইএমএল-র কৃতিত্বে এই কমিটি-ই নাগাল ধরল নন্দীগ্রামের। এদিকে ঝাড়গ্রাম-মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বীরভূমের মতো লালমাটির দেশে ক্রমশ সক্রিয় হচ্ছে ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’। ছত্রধর মাহাতদের স্পর্শে ওই আন্দোলনে তখনও লাগেনি মাওবাদী (Maoist) তকমা। যার প্রভাব ছিল নন্দীগ্রামেও। আপাত শান্ত নন্দীগ্রাম এবং খেজুরি হয়ে উঠল জমি আন্দোলনের নয়া দিগন্ত। এই সুযোগেই নন্দীগ্রামের রাশ হাতে নিলেন আনিসুর রহমান, শুভেন্দু অধিকারীরা। ৩৫ বছরের তরতাজা বিধায়ক নেতৃত্ব দিলেন নন্দীগ্রামে। সিপিএম অধ্যুষিত খেজুরি-বধ, গ্রামে গ্রামে বিক্ষোভ সংগঠিত করলেন ওঁরা। বুদ্ধদেবের বিরুদ্ধে একের পর অভিযোগ। বিরোধীদের হুমকি, অত্যাচার, মহিলাদের গণ ধর্ষণ; ‘সিপিএমের হার্মাদদে’র বিরুদ্ধে রোজ সরব হতেন শুভেন্দু। মমতা স্পর্শে যা বাড়তে থাকে ক্রমশ। রাজ্যের সিআইডি এই আন্দোলনে মাও-যোগের অভিযোগ করে। নেতা শুভেন্দুর বিরুদ্ধে ওঠে একাধিক অভিযোগ। যদিও ১৪ মার্চ, ২০০৭-এর নন্দীগ্রাম গণহত্যা কম্পন সৃষ্টি করে দেশজুড়ে। বুদ্ধ-সরকারকে রক্তাক্ত করতে একটুও জমি ছাড়েননি মমতা। দিকে দিকে বুদ্ধ বিরোধিতা, রাজ্যপাল থেকে বুদ্ধিজীবী-নিন্দা টলিয়ে দিয়েছিল বাম সরকারকে। যার রেশ নেতাই, সিঙ্গুর হয়ে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় বামেদের।

যে আবহ এবং পরিস্থিতি সৃষ্টিতে শুভেন্দু অধিকারীর কৃতিত্ব ছিল প্রথম সারিতেই! তাঁর দলপরিবর্তন এবং তীব্র অভিষেক-বিরোধিতা, নন্দীগ্রামে শুভেন্দু-ভূমিকা নিয়ে তৃণমূলের অবস্থান বদল হলেও আসলে নন্দীগ্রাম এবং শুভেন্দু এবং তার ফলশ্রুতিতে বুদ্ধদেবের বিরুদ্ধে অল আউট আক্রমণের মাস্টারমাইন্ড যে শুভেন্দু, একথা স্বীকার করেন তৃণমূল নেতাদের একাংশও। ঠিক এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েই সেই শুভেন্দুর মুখে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রশংসা অন্যমাত্রা প্রদান করছে। যেখানে মমতা বা দিলীপ ছাপিয়ে একদা পরম রাজনৈতিক শত্রু শুভেন্দু বলছেন বুদ্ধ ভাল! যদিও বামনেতা সুজন চক্রবর্তীর দাবি, ”সত্যটা তো সত্য। যিনি বললেন,
তাঁর বলার মানে আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।”

এখানেই রাজনৈতিক মহলের একাংশের যুক্তি;
প্রথমত, মমতার উত্থান এবং সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম আবহে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ভূমিকা রয়েছে। অনেকেই দাবি করেন, সেই সময় সরকার যদি তৎকালীন বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে মারাত্মক দমন-পীড়ন নীতি গ্রহণ করত, তাহলে মমতার তথা তৃণমূলের সরকার বিরোধী আন্দোলন খুব একটা সাড়া ফেলত না।

দ্বিতীয়ত, সিঙ্গুর নিয়ে রাজ্যপালের উদ্যোগ। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নমনীয় মনোভাব। এর আগের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের ক্ষেত্রেও বহাল ছিল। যেখানে দিনের পর দিন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও সরকারি তরফে ১৪ মার্চের (২০০৭) আগে তেমন কোনও বিশেষ ভূমিকা নেওয়া হয়নি।

তৃতীয়ত, শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার বা দমনে বিশেষ ভূমিকা নেননি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

চতুর্থত, ক্ষমতা থেকে সরলেও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা এবং দুর্নীতির অভিযোগের মতো কোনও অভিযোগ গায়ে লাগতে দেননি বুদ্ধ।

পঞ্চমত, তাঁর আমলে সরকারকে নিয়োগ বা অন্য কোনও বড় দুর্নীতির ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিফলিত হতে হয়নি। যেখানে তাঁর দিকে অভিযোগের আঙুল ওঠেনি সরাসরি।
নন্দীগ্রাম-কাণ্ড নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও অবশেষে, সিবিআই ক্লিনচিট পেয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।

ঠিক এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুলনায় সুকৌশলে এই মন্তব্য করে রাখলেন শুভেন্দু, যা সামগ্রিকভাবে বুদ্ধের ইমেজের স্তুতির পাশাপাশি মমতাকে পরোক্ষে বলে রাখা, আপনার থেকে উনি অনেক ভাল, তাই আপনি ব্যর্থ! -এমনই বলছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশের।

সবার খবর সঠিক খবর পড়তে চোখ রাখুন মহানগর বার্তায়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close