ফিচারদেশ

সত্যই সম্বল! গোটা হাথরাস সাক্ষী থাকলো বাঙালি মেয়ে তনুশ্রীর জেদের

গত কয়েক বছর ধরে নেটিজেনদের কুনজরে “গদি মিডিয়া।” দেশের মধ্যে সমস্যা অনেক। কৃষক আত্মহত্যা, বেকারত্ব, জিডিপি হ্রাস; প্রভৃতি প্রভৃতি। কিন্তু কোথাও যেন একটা অদ্ভূত নিস্পৃহ জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। প্রাইম টাইম জুড়ে শুধুই হয় রিয়া, নয় সুশান্ত। নয় বলিউড-ড্রাগ যোগ কিংবা অন্য কিছু। জাতীয় সংবাদমাধ্যমকে এভাষাতেই তুলোধোনা করছেন নেটিজেনরা।
তবে, সাম্প্রতিক হাথরসের ঘটনা জাতীয় সংবাদমাধ্যমের অন্য চেহারা চেনালো। নেপথ্যে জন্মসূত্রে খড়গপুরের মেয়ে বাঙালি সাংবাদিক তনুশ্রী পাণ্ডে। কর্মসূত্রে সাকিন দক্ষিণ দিল্লির লাজপত নগরে থাকেন বছর ২৬-এর এই মেয়ে। সংবাদমাধ্যমের ভাষায় ফিল্ড রিপোর্টিং বা মাঠে নেমে কাজ কী! উঠতি বা শিক্ষানবিশ সাংবাদিকদের দেখিয়েছেন তনুশ্রী। তাঁর রিপোর্টিংয়ে ভর করেই গোটা দেশ দেখেছে কীভাবে হাথরস-কাণ্ডে পরিবারের অনিচ্ছাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নির্যাতিতার শেষকৃত্য করেছে ইউপি পুলিশ। কীভাবে রাতের অন্ধকারে জ্বলেছে নির্যাতিতার দেহ। সেই সংবাদ পরিবেশনার পর থেকেই এখন নেটিজেনদের নয়ণের মণি তনুশ্রী। শত পুলিশি বাধা, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যেভাবে রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে নিজের পেশাকে প্রাধান্য দিয়েছে এই তরুণ সাংবাদিক, তাঁকে কুর্নিশ করছে গোটা দেশ।

জানা গিয়েছে, তাঁর সাংবাদিকতার বয়স মোটে ৫ বছর ১১ মাস। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বিশেষ করে বাংলা থেকে কোনও ফোন গেলে মিশুকে এই মেয়ে স্বচ্ছন্দে বলেন, “ইয়েস স্যর টেল মি। আমি কিন্তু বাঙালি। খড়গপুরের মেয়ে। বাবা ওখানকার আর মা কানপুরের।”

নিজের কীর্তি নিয়ে এতটুকুও অহম নেই তনুশ্রীর। উল্টে নিজেকে বাঙালি প্রতিপন্ন করতে বেশী মরিয়া ইন্ডিয়া টুডে নিউজ গ্রুপের এই ব্লু আইড গার্ল। বাংলার বহুল প্রচলিত ক সংবাদপত্রের ডিজিটাল মাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তনুশ্রী বলেছেন, “মা দারুণ বাংলা বলতে আর পড়তে পারেন। তার পরেও আমরা কেন পান্ডে, আমরা কেন নিজেদের বাঙালি বলি, এ সব নিয়ে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু আমি আপনাকে বলছি, আমি পুরোপুরি বাঙালি। বাঙালি ছাড়া নিজেকে আর কিছু মনেই করি না। এখন বাবা-মা গুরগাঁওয়ে থাকেন। আমি দিল্লিতে এক বান্ধবীর সঙ্গে। ও একটা কাগজের এন্টারটেনমেন্ট রিপোর্টার। আমি ওঁদের সঙ্গে থাকি না। কারণ, কখন ফোন এলে কোথায় বেরিয়ে যেতে হয়! এমনিতেই মা আমায় নিয়ে খুবই চিন্তিত থাকেন। কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদযাত্রা যেদিন কভার করতে গিয়েছিলাম, সেদিন তো মা লাফালাফি শুরু করে দিয়েছিলেন! আর এখানে আমার সঙ্গে থাকলে তো আরও চিন্তা করতেন। আসলে আমার পরিবারে কেউ কখনও সাংবাদিকতা করেনি। আমিই প্রথম। আর এই ধরনের ঘটনাও আমার জীবনে প্রথম ঘটল। তাই খুব খুশি হয়েছি।’’

তবে, ঠিক যে কারণে তনুশ্রীর এত নামডাক, সেই প্রসঙ্গে তাঁর জবাব, “আমার তোলা ভিস্যুয়াল গোটা দেশ দেখেছে এতে আমি বেশি খুশি। যেখানে ওই মেয়েটির দেহটা ওইভাবে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। আর ওর বাবা-মা-দাদাকে ঘরে আটকে রেখেছিল পুলিশ। আমি সবচেয়ে খুশি হয়েছি ওই ভিস্যুয়্যালটা মানুষকে দেখাতে পেরে। আসলে ছোটবেলা থেকেই আমি একটু প্রতিবাদী ধরনের। কোথাও কোনও অন্যায়, অবিচার দেখলে চুপ করে থাকতে পারি না। কতবার যে কত লোকের সঙ্গে রাস্তাঘাটে এই নিয়ে ঝামেলা করেছি! অন্যায় দেখলে মুখ বন্ধ করে রাখাটা আমার কাছে ক্রাইম বলে মনে হয়। আই হ্যাভ অলওয়েজ বিন আ রেবেল! প্রতিবাদী। তাই ছোটবেলা থেকেই ভেবেছিলাম হয় আইনজীবী হব অথবা সাংবাদিক। যাতে সমাজের এই সব অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারি। শেষপর্যন্ত ২০১৪ সালের নভেম্বরে ফুলটাইম সাংবাদিক হলাম।’’

এ প্রসঙ্গে নিজের সুরক্ষা ও আগামি দিনের কাজ নিয়ে রাজদীপ সারদেশাইকে গুরু মেনে চলা তনুশ্রী বলেন, ‘‘আমার এডিটর রাজদীপ স্যর (রাজদীপ সরদেশাই) আমাকে একটা কথা বলেছিলেন। খবর করতে গিয়ে নিজে যেন খবর না-হয়ে যাই। জানি, আমি ওদের রাডারে আছি। লোকে আমার মুখটা চিনে গিয়েছে। মনে রাখবে। সেটা ভাবলে একটু চিন্তা হচ্ছে। তবে ভয় নয়। ভয় আমি কাউকেই করি না। আমার কাজ থেমে থাকবে না। কাজ তো আমাকে করতেই হবে। করবও।’’

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close