কলাম

ভ্যাকেন্সি খালি আছে

 

অর্পন চক্রবর্তী

একটু ফ্লাশব্যাকে আসা যাক। ২০২১ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটের ঠিক আগের কথা ভাবুন বাংলার রাজনীতিতে তখন পদ্ম ফুলের চাষ। সেই নতুন বাগানে ঢুকতে চাইছেন বহু মালি। কেউবা পুরোনো কেউবা নতুন। পদ্ম পরিবার বিজেপির কাছে তখন একের পর এক নতুন টার্গেট। একের পর এক সেলিব্রেটিদের যোগদান পর্ব চলছে বঙ্গ বিজেপিতে। উল্টোদিকে একই কাজ জোর কদমে চালিয়ে আসছে রাজ্যের শাসক দলও তৃণমূলও। সেলিব্রেটি যোগদানের প্রতিযোগিতায় দুই দলের সেয়ানে সেয়ানে লড়াই। সেই সময় বিজেপি বুঝতে পারে এভাবে ঠিক হবেনা। কারণ এত কান্ড করেও মিডিয়া থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের একই জিজ্ঞাসা, ভাই বঙ্গ বিজেপির মুখ কে? তৃণমূলের বিরুদ্ধে নয় বিজেপি আছে বুঝলাম কিন্তু মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে আইকনিক কেউ আছে কি? বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বর কেউ কেউ এই প্রশ্নের বাস্তবতা বুঝতে পেরেছিলেন। তারাই ঠিক করলেন এমন কিছু করতে হবে যাতে বিজেপির বাজিগর সর্বস্ব ইমেজ ফুটে উঠতে পারে। মানে একদম ধামাকা কিছু। চুনোপুঁটি নয় রাঘব বোয়াল ধরতে হবে। ভোটের সব আলো যিনি শুষে নিতে পারবেন। অতঃপর বিজেপির ভাবনায় এল বাঙালি আইকন। কাকে ধরা যায়? একদিকে তো দিলীপ ঘোষ বাঙালি বুদ্ধিজীবী, অভিনেতা, শিল্পী, লেখক, কবিদের উঠতে বসতে গালাগাল করছে। অথচ সামনেই ব্রিগেড কিছু একটা করতে হবে। সেই সময় শোনা গেল সৌরভ বিজেপিতে যোগদান করছে। রাজভবনে যাচ্ছেন, বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সাথে ফোনে কথা বলছেন। এসবের পর তাহলে কি সৌরভ বিজেপিতে? মুখ্যমন্ত্রী পদে সৌরভ? বাঙালি আইকনের এটা অধ:পতন নাকি পরিবর্তন মাত্র? এসব চুলচেরা বিশ্লেষণ এর পর অবশেষে সৌরভ গেলেন তবে বিজেপিতে নয় হার্টের সমস্যা নিয়ে নার্সিংহোমে। ভর্তিও থাকলেন কিছুদিন। তাই বলাবাহুল্য তাঁর বিজেপিতে আসার কোনো প্রশ্নই থাকলো না। কিন্তু তাঁর শূন্যস্থান পূরণ করে দিলেন বাঙালির আরেক অবতার। একদা নকশাল তারপর অতিবাম থেকে বাম হয়ে ডানে আসা অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী। কোনো প্রেস কনফারেন্স নয়, টুইট নয়, ফেসবুক পোস্ট নয়। একদম সরাসরি ব্রিগেডের মাঠে বিজেপির পতাকা হাতে উদয় হলেন “জাতগোখরো”। বঙ্গ বিজেপিতে বাঙালি আইকনের ভ্যাকেন্সি পূর্ণ হলো।

কিন্তু তাঁর দায়িত্ব কি? কেন এত ঢাক ঢোল পিটিয়ে মিঠুনের যোগদান করানো হয়েছিল? এর কারণ বিশ্লেষণ করলেই বর্তমানে সৌরভকে ধরে অমিত শাহের মার্কেটিং এর অন্যতম কারণ বেরিয়ে আসবে। বিজেপি আসলে একজন প্রচারক চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন একজন এমন ‘ওপিনিয়ন লিডার’ যিনি সাপের গালে চুমু খাক ব্যাঙের গালেও চুমু খাক অসুবিধা নেই। যাকে বেশি কিছু বলতে হবেনা কিন্তু যার যোগদানটাই আলাদা বার্তা বহন করবে। জিতবে কি হারবে সেটা পরের কথা। টিকিট পাবে কি পাবেনা সেটাও বহু দিন উহ্য ছিল। আসলে মিঠুনকে বিজেপিতে জায়গা করে দেওয়ার মাধ্যমে বিজেপির বাঙালি বিরোধী তকমাটার তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তি চেয়েছিলেন বিজেপির উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বরা। তাঁরা চেয়েছিলেন হাটে বাজারে মানুষ বলে বেড়াবে- ভাই দেখলি এবার মিঠুনও বিজেপিতে, কিছুতো একটা ব্যাপার আছে, নইলে মিঠুন কখনও বিজেপিতে যায়? এটা সত্যি মানুষ হয়তো একথা বলা শুরু করেছিল, তবে বলার পর ভেবেছিল অন্য কিছু। ভোটমুখী জনতা বিজেপির পক্ষে শেষমেশ রায় দেয়নি। মিঠুনও তারপর সুযোগ বুঝে কেটে পড়েছেন। তবে এই মিঠুন কিন্তু বিজেপিতে থাকতে মমতা ব্যানার্জির নামে কুৎসা করেন নি, রাজ্য সরকারের চালু স্কিমগুলো নিয়ে ক্ষোভ দেখান নি। শুধু বিজেপির প্রশংসা করে গেছেন কারোর নিন্দে বেশি করেন নি। কাদা ছোড়াছুড়িতে না নেমে একজন প্রচারকের ভূমিকা যেমন হয়।

আসলে বাংলায় বিজেপির গান গাওয়ার জন্য একজন সোনু সুদ নেই, অক্ষয় কুমার নেই,অনুপম খের নেই কঙ্গনা তো দূর কি বাত। সেই যন্ত্রণা বিজেপি বোঝে। সেখানেই কি সৌরভের সাথে বোঝাপড়াতে আসতে চাইছে বিজেপি? কিছু সুবিধা, কিছু প্রিভিলেজের আদান প্রদানের দ্বারা? উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ব্রাকেটে রেখে ডেডিকেশনের নামে সৌরভ সেদিকে যে পা বাড়িয়ে আছেন সেটা শাহ কোম্পানি ভালো করেই জানেন। তাই যত দিন এগোবে কখনও গড়ের মাঠে, কখনও নৈশভোজে, কখনও ইডেনে ইন্ডিয়া পাকিস্তান ম্যাচে মোদি-শাহরা সৌরভের সাথে নিজেদের ঘনিষ্ঠতা দেখিয়ে বাংলায় বিজেপির পলিটিক্যাল মার্কেটিং-টা সারতে চাইবেন। বাংলায় অক্ষয় কুমার, অনুপম খেরের ভ্যাকেন্সিটা যে অনেক দিন খালি পরে আছে।

(লেখকের মতামত নিজস্ব)

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close