কথা ও কাহিনীকলাম

অভিযানের আগেই আত্মসমর্পণ! মমতা-বিরোধে বামেদের থেকে কেন পিছিয়ে পদ্ম-শিবির?

                     লেখক: রমেন দাস(সাংবাদিক)

নেতার আমি, নেতার তুমি লড়াই দিয়ে যায় চেনা! ঢাল নেই, নিধিরাম সর্দার! মঙ্গলবার দিনভর ফাঁকা কলসির ঠন ঠন আওয়াজের গেরুয়া-নেতাদের দেখল রাজ্য! ধরার আগেই প্রিজন ভ্যানের অন্দরেই শেষ হল সব লড়াই! পড়ে পড়ে মার খেলেন শুধু, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিজেপি কর্মীরা। জল কামানের সামনে বিপর্যস্ত হল তৃণমূলস্তরের কর্মীদের লড়াই! আর নেতারা রইলেন পুলিশের যত্নে! মঙ্গলবার সারাদিনব্যাপী বিজেপির নবান্ন অভিযান এবং তাঁর এগিয়ে চলার দৃষ্টান্ত যদি এক কথায় বলা যায়, তাহলে ঠিক এমনটাই দাঁড়ায়। আর এ কথা শুধু আমরা বলছি না, বলছেন নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক রাজ্য বিজেপির ছোট নেতাদের একাংশও।

প্রসঙ্গত, আজ অর্থাৎ ১৩ সেপ্টেম্বর, রাজ্য বিজেপির তরফে নবান্ন অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছিল। প্রথমত, এই অভিযানের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয় বঙ্গ বিজেপির তরফে। পরিবর্তিত তারিখ অর্থাৎ ১৩ সেপ্টেম্বরের এই নবান্ন অভিযানের আবহে একাধিক পরিকল্পনা সেরেছিলেন সুকান্ত মজুমদার, শুভেন্দু অধিকারীরা। প্রস্তুত ছিল পুলিশ-প্রশাসনও। প্রথম থেকেই পরিকল্পনা করে নবান্নের কাছে ঘেঁষতে না দেওয়ার ছক কষছিল হাওড়া পুলিশ কমিশনারেট। অভিযানের ঠিক আগেই বিজেপির রাজ্য দফতরে মেইল পাঠিয়ে পুলিশের পক্ষে জানানো হয়, নবান্ন এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকা স্পর্শকাতর এবং উচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া হয়, তাই ওই এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি থাকে। সেই প্রেক্ষাপটে সাঁতরাগাছি এবং হাওড়া ময়দান এলাকায় বিজেপির সভা এবং অভিযানে না করে পুলিশ। কিন্তু বঙ্গের রাজনৈতিক আবহে বিরোধীদের কর্মসূচিতে যে অনুমতি আসবে না, এই বিষয়টি জেনেই এগোন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা। সেই মোতাবেক বিজেপি নেতা-কর্মীরা নবান্ন অভিযানে যোগ দিতে জেলা থেকে রওনা দিতে শুরু করেন সোমবার থেকে। অভিযোগ ওঠে, স্টেশনেই আটকে দেওয়া হচ্ছে বিজেপি কর্মীদের। বঙ্গের শীর্ষনেতারা অভিযোগ করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসন ভয় পেয়ে আগেভাগেই আটকে দিচ্ছে কর্মীদের।

অভিযানে বিজেপি নেতা কর্মীরা

সমস্ত বিতর্ক আর অভিযোগের প্রত্যাঘাত মাথায় নিয়ে, আবহাওয়ার বিরূপ মনোভাবের মধ্যেই শুরু হয় বিজেপির নবান্ন অভিযান। যদিও মমতার নবান্ন অনুপস্থিতির মধ্য়েই পার্থ-অর্পিতা, অনুব্রত এবং দুর্নীতির অভিযোগে অনাবৃত তৃণমূলকে চাপে ফেলতে এটাই ছিল বিজেপির ‘মাস্টার্সট্রোক’। একদিকে শুভেন্দু অধিকারী, লকেট চট্টোপাধ্যায়। অন্য দিকে সুকান্ত মজুমদারের নেতৃত্বে, দিলীপ ঘোষদের পাশে রেখে শুরু হয় অভিযান। কিন্তু ভালোই ভালোই সব চলতে চলতেই খেই হারায় বিজেপির সব উদ্যোগ।

কেন? দেখা যায়, কলকাতাতেই বন্দি হয়েছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু। মমতার বিরুদ্ধে হুঙ্কার, আদালতে যাওয়ার হুমকি দিয়েও পুলিশের প্রিজন ভ্যানে আসন খুঁজে নেন তিনি। সাঁতরাগাছির জমায়েতস্থলে যাওয়ার আগেই লকেট, রাহুল সিনহা-সহ শুভেন্দুর জমায়েত হয় লালবাজারে। এদিকে খানিকটা লড়তে শুরু করেন বিজেপি কর্মীরা। হাওড়ায় ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টায় উত্তেজনা ছড়ায়। জলকামান, লাঠির আঘাত পড়ে কর্মীদের পিঠে। ভাঙচুর, গাড়িতে আগুন লাগানোর চেষ্টার অভিযোগ ওঠে বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে নেতার মুক্তির দাবিতে নবান্ন অভিযানের নগণ্য ভিড় পৌঁছয় লালবাজারের সামনে। বেলা গড়াতেই শেষ হয় বিজেপির বহু প্রতীক্ষিত নবান্ন অভিযান। পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে দুর্নীতি-ইস্যুকে হাতিয়ার করে বিরাট বিরোধীশক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে অচিরেই থমকে যেতে হয় বঙ্গ-বিজেপিকে।

জমায়েতে জলকামান চালাচ্ছে পুলিশ

অনেকেই বঙ্গ বিজেপিকে ব্যঙ্গ করে বলছেন, এর তুলনায় শ্রীভূমির পুজো প্যান্ডেলের ঠাকুর দেখতে বেশি লড়তে হয়! কেন এই প্রশ্ন উঠছে? কেন ফের ব্যর্থ বঙ্গের বিজেপি নেতারা? তাহলে কি ‘সেটিং’ তত্ত্বে সিলমোহর দিচ্ছেন বিজেপির নেতারা? মমতার সঙ্গে লড়তে এখনও অপারগ বিজেপি? নাকি দিলীপ ঘোষের নেতৃত্বের বঙ্গের বিজেপি আর এই বিজেপি ভিন্ন? সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খতিয়ে দেখার আবহে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন অভিযান আর বিরোধীশক্তি প্রদর্শনের সাম্প্রতিক ইতিহাস।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের ব্যাখ্যা, নির্বাচনের আগে অমিত শাহের বঙ্গসফর এবং বিদ্যাসাগর-মূর্তি ভাঙার উত্তেজনার পর সেইভাবে বিজেপিকে রাস্তায় খুঁজে পান না অনেকেই। সংবাদমাধ্যম আর সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া বিজেপির অস্তিত্ব ঠিক কতটা, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আজকের অভিযানের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে এই বিজেপিরই যুব মোর্চার ডাকে নবান্ন অভিযানের।

৮ অক্টোবর, ২০২১। করোনা আবহ সবেমাত্র কাটছে। ঠিক সেই পরিস্থিতিতে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল পরাজয়ের পর ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে বঙ্গ বিজেপি। যুবমোর্চার কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক তেজস্বী সূর্যের উপস্থিতিতে নবান্ন অভিযানের ডাক দেওয়া হয়। একাধিক মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায় বিজেপি। নজিরবিহীনভাবে রঙ মেশানো জল স্প্রে করা হয় বিজেপি কর্মীদের উপরে। যা ২০২০ সালে বিজেপির নবান্ন অভিযানেও ব্য়াবহার করা হয়। তখন যদিও জলে রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগ ওঠেনি।

২০২১ বিজেপি যুব মোর্চা নবান্ন অভিযান

বিক্ষোভ, বিতর্ক শুরু হয়। নবান্ন অভিযান গিয়ে দাঁড়ায় রঙ মেশানো জল বিতর্কে। দিল্লিতে এর নজির থাকলেও এ রাজ্যে এর ব্যবহার আগে দেখা যায়নি। অসুস্থ হন একাধিক। রাজ্যজুড়ে বিজেপি নেতা রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসুস্থতার ছবি প্রকাশ্য়ে আসে। এর আগেও বিজেপির নবান্ন অভিযানের ডাকে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। সায়ন্তন বসু, দিলীপ ঘোষদের হুঙ্কার শোরগোল ফেলেছিল রাজ্য রাজনীতিতে। কিন্তু খুব একটা ধোপে টেকেনি কিছুই! এখানেই রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, আলোচনায় উঠে আসছে নির্বাচনে শূন্য আসন পাওয়া বামেরা। অনেকেই বলছেন, নবান্ন অভিযান বা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অনেক বেশি সক্রিয় বামেরা। যেখানে দাঁড়িয়ে সাম্প্রতিক সময়ের বর্ধমান-কাণ্ডের কথা বলছেন কেউ কেউ। আইন অমান্য ঘিরে পুলিশকে নাস্তানাবুদ করেছিলেন সিপিএম নেতারা। ‘কলাচুরি’র অভিযোগ ছাপিয়ে সিপিএমের জঙ্গি আন্দোলন, বিক্ষোভ চাপে ফেলেছিল জেলা পুলিশকে। গ্রেফতার হন একাধিক বামনেতা, কর্মী। প্রসঙ্গত, আজই জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ওই ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া বামনেতা আভাস রায়চৌধুরী। যদিও এর সঙ্গেই মমতা-রাজত্বে বামেদের নবান্ন অভিযান ঘিরেও ছড়িয়েছিল উত্তেজনা। একের পর এক ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে গিয়েছিলেন সিপিএম নেতা, কর্মীরা।

বর্ধমানের ঘটনায় আজ জেল থেকে ছাড়া পেলেন সিপিআইএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আভাস রায় চৌধুরী

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২। শাসকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে সামিল হয়েছিল বাম যুবনেতা, কর্মীরা। উত্তেজনা ছড়ায় এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। রাস্তায় পড়ে পুলিশের লাঠি খান যুব নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি। সোশ্য়াল দুনিয়ায় ভাইরাল হয় সেই ছবি। তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রায় ১০ দিন পর ছাড়া পান নেত্রী। এখানেই প্রশ্ন উঠেছে। বিজেপি নেতারা কি বারবার কর্মীদের এগিয়ে দিয়েই রণে খান্ত হচ্ছেন? যত আঘাত কর্মীদের গায়ে পড়তে দিয়ে সরে যাচ্ছেন নেতারা? যা সিপিএমের কর্মসূচিতে দেখা যায় না। যেখানে প্রায় বিপরীতভাবেই আঘাত পান বৃদ্ধ বিমান বসুরাও।

সেখানে দাঁড়িয়ে কেন বিজেপির রণকৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে? আজকের ঘটনা পরম্পরা নিয়ে কেউ কেউ বলছেন, আগেভাগেই সভাস্থলে না গিয়ে বেলায় কলকাতা থেকে লোকলস্কর নিয়ে সকলকে জানিয়ে বেরোলেন শুভেন্দু! তিনি জানতেন যে আটক করবে পুলিশ। অচিরেই যেন ইচ্ছা করেই অভিযানের আগেই ধরা দিলেন তিনি? এই প্রসঙ্গেই কটাক্ষে সরব হয়ে সুকৌশলে বিজেপি কর্মীদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূল নেতা দেবাংশু ভট্টাচার্য। যদিও তাঁর আক্রমণের কেন্দ্রে শুভেন্দু। আর এই পরিস্থিতিতেই প্রশ্ন উঠেছে, রাহুল সিনহা, লকেটের মতো নেতারাও সংবাদমাধ্যমের সামনে ‘মমতা হায় হায়’ বলেই সরে গেলেন! অর্থাৎ জল কামান আর লাঠি তোলা রইল কর্মীদের জন্য। যাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন বিজেপি নেতারাই। রবীন্দ্র সরণিতে গাড়িতে আগুন আর সাঁতরাগাছিতে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট; বিজেপি কর্মীদের খানিকটা আক্রমণ ছাড়া বিজেপি নেতারা নিষ্ক্রিয় রইলেন এদিন। যদিও এই তাঁরাই কিন্তু উত্তেজিত ভাষণ দিয়েছিলেন আগেভাগেই।

আজকে নবান্ন অভিযানে গ্রেফতার হচ্ছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী

দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘বাঁশ দিয়ে মারব, যাতে দাগ বোঝা যায়!’ শুভেন্দু, সুকান্ত বাদ যাননি কেউ। কর্মীদের একটা বড় অংশ দলের জন্য নামেন বটে। কিন্তু লড়াই? লড়াই আর হল কই? নেতাদের গা বাঁচিয়ে গ্রেফতারি আর কর্মীদের পিঠ খুলে লাঠির ঘা খাওয়া, বঙ্গ-বিজেপি এবং তাদের সাম্প্রতিক রাস্তা-যাপনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কেউ কেউ বলছেন, তাহলে কি লোকদেখানো হুঙ্কার আর ভিড় জমানোর কৌশল ছাড়া আর কিছুই নেই বঙ্গের গেরুয়া-গৃহে! নাকি বঙ্গ বিজেপি কাজের কাজ করতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে দিলীপ ঘোষ নেতৃত্বে নেই বলেই! প্রশ্ন উঠছে দলের অন্দরেই। কিন্তু উত্তর…!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
নিজের লেখা নিজে লিখুন
Close
Close